রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও পরিবেশবান্ধব ও যাত্রীবান্ধব করার লক্ষ্যে ২০০টি অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক বাস ಖರೀದির এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় মোট ২০০টি বাসের মধ্যে ১০০টি বাস বিশেষায়িত রুটে শুধুমাত্র নারী যাত্রীদের জন্য পরিচালিত হবে। নারীদের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক এবং সম্মানজনক যাতায়াত নিশ্চিত করতে এই বিশেষ বাসসেবা আরও সম্প্রসারণ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) আয়োজনে ‘মহিলা বাস সার্ভিস (পিংক বাস)’ কার্যক্রমের এক জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সেতুমন্ত্রী বিস্তারিত জানান, সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী এই ২০০টি বৈদ্যুতিক বাস সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, সাধারণত আন্তর্জাতিক দরপত্র এবং অনুমোদনের মতো দীর্ঘমেয়াদী ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত দেড় বছর সময় লেগে থাকে। কিন্তু পরিবেশ দূষণ রোধ এবং দ্রুত পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন চালু করার তাগিদ থেকেই সরকার সরাসরি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে করে খুব দ্রুতই এই সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা অত্যন্ত জরুরি। এই লক্ষ্য অর্জনে বৈদ্যুতিক বাসের ভূমিকা হবে অপরিসীম, যা ঢাকার সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং পরিবেশ রক্ষায় বড় অবদান রাখবে।
নারীদের যাতায়াত সুবিধার বিষয়ে আলোকপাত করে শেখ রবিউল আলম জানান, মোট ২০০টি বৈদ্যুতিক বাসের মধ্যে ১০০টি বাস নির্দিষ্ট কিছু রুটে শুধুমাত্র নারী যাত্রীদের জন্য বরাদ্দ করা হবে। এর ফলে নারীদের জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক বাসসেবার পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে দেশের কয়েকটি জেলায় নারীবান্ধব বাসসেবা চালুর প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই এই সেবা দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতেও সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে নারীদের জন্য ১৩টি রুটে মোট ১৪টি বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ১০টি রুটে ১০টি বাস চলাচল করবে, যার মধ্যে একটি একতলা এবং নয়টি দ্বিতল বাস। এছাড়া চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় দুটি করে রুটে মোট চারটি দ্বিতল বাস চালানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
নারীদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে মন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কেবল বাসের ভেতরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই চলবে না; বরং বাসের জন্য অপেক্ষার সময় থেকে শুরু করে গন্তব্যে পৌঁছে নামার আগ পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথ নিরাপদ হতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বাস ওঠানামার সময় হয়রানি বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারের আগ্রহ কমে যায়, যা তাঁদের চলাফেরার স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী এবং জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। নারীরা যাতে তাঁদের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দেশের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারেন, সেজন্য নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মন্ত্রী জানান, সংস্থাটি বর্তমানে ৫০০টির বেশি বাস সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করছে এবং তাদের মোট বাসের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২০০টি বা তারও বেশি। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বর্তমানে সংস্থাটি লোকসানের মুখে নেই, বরং আয়-ব্যয়ের একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা এবং সেবার মান আরও উন্নত করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য চালু হওয়া এই বিশেষ বাসসেবা যাতে পূর্বের অনেক উদ্যোগের মতো সাময়িক হয়ে না পড়ে এবং কিছুদিন পর বন্ধ হয়ে না যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
শেখ রবিউল আলম বলেন, আজকের এই উদ্বোধনের পর আগামী দুই মাসের মধ্যে সেবার মান আরও উন্নত করতে হবে। প্রতিদিনের তদারকি এবং ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে একে আরও নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব করে তুলতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্যে এই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; বরং এই সেবাটিকে টেকসই করা, সমৃদ্ধ করা এবং ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করাই হবে আসল চ্যালেঞ্জ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ, সড়ক সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক এবং বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লাসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।











