নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বিশেষ ‘পিংক বাস’ সার্ভিস উদ্বোধন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর তেজগাঁও বিআরটিসি বাস ডিপোতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সড়ক ও রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব। অনুষ্ঠানে তিনি দেশ গড়তে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং বলেন, বিআরটিসির এই ‘পিংক বাস’ যেন নারী যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের এক অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠে।
প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকারের গৃহীত ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুদূরপ্রসারী নির্দেশনায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সড়ক পথে নারী যাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিআরটিসির এই বিশেষ মহিলা বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম করা বিআরটিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সকল অংশীজনদের তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান।
দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান যুগে কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে প্রতিদিন অগণিত নারী ঘর থেকে বের হন। তবে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তাঁরা প্রায়ই নানা প্রতিকূলতা ও নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হন, যার ফলে অনেক সময় তাঁদের জন্য নির্বিঘ্ন যাতায়াত সম্ভব হয় না। উন্নত বিশ্বের কল্যাণমূলক রাষ্ট্রগুলোতে নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস চালু থাকা একটি সাধারণ বিষয় হলেও বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে তা অধরা ছিল। এই শূন্যতা পূরণে সরকার এখন কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, শুধুমাত্র নিরাপদ যাতায়াত নয়, বরং পরিবহন খাতের পেশাগত ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দায়িত্ববোধ থেকেই বিশেষ ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুর ক্ষেত্রে মহিলা চালক এবং মহিলা কন্ট্রাক্টর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়া শহরের মোট ১৩টি রুটে ১৪টি বাস নিয়ে এই সেবা চালু হচ্ছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ১০টি, বগুড়ায় দুটি এবং চট্টগ্রামে দুটি বাস পরিচালিত হবে, যা মোট ১৩৪টি স্টপেজে যাত্রীসেবা প্রদান করবে।
যাত্রীদের সুবিধা বৃদ্ধির জন্য এই বিশেষ মহিলা বাস সার্ভিসে আধুনিক ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর ফলে নারী যাত্রীরা বাসে ওঠার আগেই খুব সহজে টিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন, যা কাউন্টারে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার ভোগান্তি কমিয়ে আনবে। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে তিনটি বাসে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রতিটি বাসে বিটিএস (BTS) সংযোজন করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী জানান, বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে আরও ১০০টি ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিআরটিসির বহরে পরিবেশবান্ধব এই ইভি বাসগুলো যুক্ত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি আরও জানান, বিআরটিসির বহরে নতুন বাস সংযোজনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ঋণ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে।
মহিলা চালক ও কন্ট্রাক্টরদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা এবং অনুকূল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। সরকারের এই উদ্যোগ কেবল যাতায়াত সহজ করবে না, বরং নারী কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি বিশ্বাস করেন, বিশ্বজুড়ে নারীরা যেভাবে সামনের সারিতে এগিয়ে যাচ্ছেন, বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগ আগামী দিনে বাংলাদেশের নারীদের আরও এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। প্রশাসনসহ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে এগিয়ে গিয়ে একটি অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর, আধুনিক ও যুগোপযোগী বাংলাদেশ গড়ে তুলবেন—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ বিআরটিসির বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ব্যক্তিবর্গ।










