নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হেনস্তার এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘাতের সময় ভিডিও ধারণ করায় কয়েকজন ছাত্রদল নেতাকর্মীর দ্বারা দুই সাংবাদিককে মারধর ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তাদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ জোরপূর্বক মুছে ফেলার অভিযোগ আনা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) গভীর রাত সাড়ে ৩টার দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক উকিল হল এবং সংলগ্ন পকেট গেট এলাকায় এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। হেনস্তার শিকার হওয়া ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা হলেন—মানবজমিনের নোবিপ্রবি প্রতিনিধি মাহী ছিদ্দীকী সিয়াম এবং প্রতিদিনের সংবাদের নোবিপ্রবি প্রতিনিধি মেহেদী হাসান।

অভিযোগের মুখে পড়েছেন ছাত্রদল কর্মী বাংলা বিভাগের ১৭তম আবর্তনের আতিক হাসান, অর্থনীতি বিভাগের ১৮তম আবর্তনের তানভীর ভূঁইয়া, আইন বিভাগের ১৯তম আবর্তনের খাঁন মোহাম্মদ রোম্মান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১৮তম আবর্তনের ফাইসাল হোসাইন এবং কৃষি বিভাগের ১৮তম আবর্তনের এমকেএম আকরাম খান। তাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বাধা প্রদান এবং শারীরিক লাঞ্ছনার গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে।

বিস্তারিত জানিয়ে সাংবাদিক মাহী ছিদ্দীকী সিয়াম বলেন, হলের ছাদের দিক থেকে চিৎকার এবং মারামারির শব্দ শুনে তিনি ঘটনাটি দেখতে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে তিনি দেখেন, ছাত্রদলের একটি পক্ষ অন্য পক্ষকে ধাওয়া করে হল থেকে বের করে দিচ্ছে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির ভিডিও করার সময় হঠাৎ কয়েকজন তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেন। মাহীর দাবি, “রোম্মান আমাকে ধাক্কা দিয়ে আমার হাতে ও ঘাড়ে আঘাত করেন এবং মোবাইল ফোনটি দেখাতে বলেন। এরপর জোরপূর্বক আমার ফোন আনলক করিয়ে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজগুলো মুছে ফেলা হয়। শুধু তাই নয়, আমি অন্য কোথাও ভিডিও পাঠিয়েছি কি না তা নিশ্চিত করতে আমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাপও তারা পরীক্ষা করে দেখেন। সব মুছে ফেলার পর তারা আমাকে ছেড়ে দেন এবং এই বিষয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য হুমকি প্রদান করেন।”

অন্যদিকে, প্রতিদিনের সংবাদের প্রতিনিধি মেহেদী হাসান জানান, ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হাতাহাতির দৃশ্য ভিডিও করার সময় ফাইসাল হোসাইন তার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন এবং ভিডিও ধারণ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে তাকে ও মাহীকে ধাক্কা দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

জানা গেছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে আবদুল মালেক উকিল হলে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মূলত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকপন্থী এবং সিনিয়র সহসভাপতিপন্থী নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির খবর পেয়ে সংবাদ সংগ্রহের জন্য যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখনই এই হামলার ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পর ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা এবং নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নাহিদুল ইসলাম তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত দুই ক্যাম্পাস সাংবাদিকের ওপর এই হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তারা দুজনই আমাদের সমিতির সদস্য। আমরা এই ঘটনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাব। ক্যাম্পাসে ভয়ভীতিহীনভাবে সাংবাদিকতা করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।”

এ বিষয়ে নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “আমি এই পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই এবং বিস্তারিত কিছু জানি না। তবে আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব এবং এরপর যথাযথ মন্তব্য করতে পারব।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ এফ এম আরিফুর রহমান জানান, ঘটনার কথা হলের প্রভোস্ট বডি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনসার সদস্যদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং প্রক্টরিয়াল বডির একটি জরুরি সভা ডাকা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিকদের হেনস্তার বিষয়ে সাংবাদিক সমিতির সভাপতির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমরা আনুষ্ঠানিক অভিযোগের অপেক্ষায় আছি। অভিযোগ পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”