অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক টেস্ট জয় ক্রিকেট বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং দেশজুড়ে বয়ে এনেছে অনাবিল আনন্দ। বিশেষ করে দেশটির কিংবদন্তি ক্রিকেটার অ্যাডাম গিলক্রিস্টের মুগ্ধতা এই জয়ের মাহাত্ম্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বিস্মিত হয়ে অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজকে অভিনন্দন জানিয়েছেন সাবেক এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে পরাজিত করার পর গিলক্রিস্টের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন মিরাজ।

ম্যাচে ব্যাট ও বল—উভয় বিভাগেই বাংলাদেশের জয়ে অনন্য অবদান রাখা মিরাজকে স্বয়ং গিলক্রিস্ট সাক্ষাৎকার নেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে মিরাজ বলেন, ‘সবচেয়ে ভালো লেগেছে এই যে, এখানে অনেক কিংবদন্তি ক্রিকেটারকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। আজ পাঁচ উইকেট নেওয়ার পর যখন অ্যাডাম গিলক্রিস্ট আমার সাক্ষাৎকার নিলেন, তখন বিষয়টি আমার কাছে সত্যিই বিশেষ মনে হয়েছে। তাকে খুব খুশি এবং উচ্ছ্বসিত দেখেছি।’

বাংলাদেশ দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স নিয়ে গিলক্রিস্টের মন্তব্যগুলো মিরাজ বিস্তারিতভাবে জানান। তিনি বলেন, ‘তিনি আমাকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে বাংলাদেশ দল অত্যন্ত মানসম্মত ক্রিকেট খেলেছে। তিনি আরও বলেন, তোমরা আমাদের অবাক করে দিয়েছ; তোমরা যে এভাবে ক্রিকেট খেলতে পারো, তা আমরা আগে কখনো ভাবিনি।’ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৯৬টি টেস্ট ও ২৮৭টি ওয়ানডে খেলা এক মহীরুহের কাছ থেকে এমন প্রশংসা পাওয়াকে মিরাজ তার ক্যারিয়ারের এক বিশেষ অর্জন হিসেবে দেখছেন। তার ভাষায়, ‘যখন এমন একজন কিংবদন্তি আমাদের দল সম্পর্কে এত ইতিবাচক কথা বলেন, তখন নিজের ভেতরে এক ধরনের তৃপ্তি কাজ করে।’

ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের এই অভাবনীয় জয়ের নেপথ্যে মিরাজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ইনিংসে তার ব্যাট থেকে আসা ৬৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসটি দলের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। তার এই লড়াইয়ের ওপর ভর করে বাংলাদেশ ৪২৬ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় এবং স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২২৮ রানের এক বিশাল লিড নেয়। দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে মিরাজ ছিলেন আরও বিধ্বংসী। মাত্র ৬৬ রান খরচ করে ৫টি উইকেট শিকার করে তিনি অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে অলআউট করতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এটি তার টেস্ট ক্যারিয়ারের ১২তম পাঁচ উইকেট শিকার।

নিজের ক্যারিয়ারের সব পাঁচ উইকেট শিকারের মধ্যে ডারউইনের এই পারফরম্যান্সটিকে সবচেয়ে স্মরণীয় মনে করছেন মিরাজ। তিনি বলেন, ‘আমার সব পাঁচ উইকেটের মধ্যে এটি অবশ্যই সবচেয়ে বিশেষ। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এমন প্রতিকূল পরিবেশে পাঁচ উইকেট পাওয়া একজন স্পিনারের জন্য বড় আশীর্বাদ।’

ম্যাচের শেষ পর্যায়ে অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশকে জয়ের জন্য মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য দেয়। এক উইকেট হারিয়েই সেই লক্ষ্য স্পর্শ করে বাংলাদেশ। মমিনুল হকের একটি দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারির মাধ্যমে নিশ্চিত হয় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম ঐতিহাসিক টেস্ট জয়, যা ক্রিকেট ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মজার ব্যাপার হলো, এর আগে প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে বাংলাদেশ মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল। সেই চরম ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এই জয় ছিনিয়ে আনার কৃতিত্ব পুরো দল এবং টিম ম্যানেজমেন্টকে দিয়েছেন মিরাজ। তার মতে, প্রস্তুতি ম্যাচের বিপর্যয় সত্ত্বেও দলের খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসে যেন কোনো চিড় না ধরে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখেছিলেন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। সেই অটুট বিশ্বাস এবং মানসিক দৃঢ়তারই চূড়ান্ত ফল হিসেবে এসেছে ডারউইনের এই ঐতিহাসিক জয়।