পূর্ব কঙ্গোতে প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, যার ফলে পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আতঙ্ক। গত এক সপ্তাহে দেশটিতে এই মরণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১,৫০০-এরও বেশি মানুষ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও ভাইরাসটির সংক্রমণের গতি অত্যন্ত দ্রুত, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সরকারের সর্বশেষ তথ্যানুসারে, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত মোট ৩,৪৪২ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং এর মধ্যে ১,৫২১ জনের মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। গত ১৫ মে দেশটিতে এই প্রাদুর্ভাবের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকদের মতে, এবারের এই মহামারীর জন্য দায়ী হলো ‘বুন্দিবুগিও’ নামক ইবোলা ভাইরাসের একটি বিশেষ ধরন। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নির্দিষ্ট ভাইরাসটির বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনো অনুমোদিত টিকা বা কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ৭৯৭ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে বা আইসোলেশন সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং ৬১৫ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে সংক্রমণের বিস্তার রোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত ‘কন্টাক্ট ট্রেসিং’ বা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের কার্যক্রম আশঙ্কাজনকভাবে ধীরগতিতে চলছে। সারাদেশে শনাক্ত হওয়া সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ৭৮ শতাংশকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, মহামারীর সংক্রমণ সম্পূর্ণভাবে রোধ করতে হলে এই হার অন্তত ৯৫ শতাংশ হওয়া অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ব্যর্থতার পেছনে কেবল স্বাস্থ্যগত কারণ নেই, বরং ওই অঞ্চলের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিও দায়ী। সশস্ত্র সংঘাত এবং অবৈধ খনি খনন কার্যক্রমের ফলে সৃষ্ট ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা হাজার হাজার মানুষকে খুঁজে বের করা বা তাদের ওপর নজর রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই প্রাদুর্ভাবটি মূলত পূর্ব কঙ্গোর প্রত্যন্ত ইতুরী প্রদেশে সীমাবদ্ধ, যেখানে মোট আক্রান্তের প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে। তবে ভাইরাসটি এখন তার সীমানা ছাড়িয়ে দেশটির অন্যতম বড় শহর কিসাঙ্গানিসহ আরও পাঁচটি প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর বিপরীতে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা থেকে এসেছে কিছুটা আশার খবর। জুনের মাঝামাঝি সময়ে শেষ রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়ার পর, মঙ্গলবার উগান্ডা নিজেদের ইবোলামুক্ত ঘোষণা করেছে। ইবোলা একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা মূলত বমি, রক্ত বা বীর্যের মতো শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শে ছড়ায়। এই রোগে আক্রান্ত হলে রোগীর শারীরিক অবস্থা দ্রুত গুরুতর হয়ে ওঠে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা প্রাণঘাতী হয়।
পূর্ববর্তী যেকোনো প্রাদুর্ভাবের তুলনায় এবারের সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুর গতি অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৪-২০১৬ সালের প্রাদুর্ভাবে ২৮ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন। তবে সেই সময় মৃতের সংখ্যা ১ হাজারে পৌঁছাতে প্রায় আট মাস সময় লেগেছিল, অথচ এবারের প্রাদুর্ভাবে এই সংখ্যাটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বর্তমানে কম। কারণ ইবোলা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না, বরং শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শ প্রয়োজন হয়; ফলে শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের তুলনায় এটি ছড়িয়ে পড়া অনেক বেশি কঠিন। সংস্থাটি আরও জানায়, আক্রান্ত অঞ্চলের বাইরে যেসব রোগী শনাক্ত হয়েছে, তাদের দ্রুত চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করার ফলে সংক্রমণ হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে কঙ্গোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, দেশটির ভেতরে সংক্রমণের ঝুঁকি এখনো চরম পর্যায়ে রয়েছে।
দ্রুত বিস্তারের পাশাপাশি জনমনে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ার পাশাপাশি ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলার আশঙ্কায় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অনেক অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মী ও উদ্ধারকারী দল সেইসব এলাকা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এছাড়া ইবোলা ভাইরাস নিয়ে ভুল তথ্যের বিস্তার এবং প্রথাগত শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ফলে স্থানীয়দের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে, যার ফলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষ করে ইতুরীর নিয়াকুন্দে স্বাস্থ্য এলাকায় গত ১৫ জুলাই একটি হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়, যার পর আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলো সাময়িকভাবে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করে। একজন রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ওই হামলার সূত্রপাত হয়েছিল। কর্মকর্তাদের মতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আফ্রিকা সিডিসি, সামারিটানস পার্স এবং মার্সি কর্পস-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর প্রস্থানের ফলে রোগ পর্যবেক্ষণ, কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী সামগ্রী সরবরাহের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ওই স্বাস্থ্য অঞ্চলের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. ডেজিরে দুয়াবো জানান, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং পরিচালনগত সহায়তার বড় অংশই এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সরবরাহ করত। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে তাদের হাতে থাকা সামান্য মজুদও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের ন্যাশনাল পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের ইবোলা মোকাবিলা কার্যক্রমের ইনসিডেন্ট ম্যানেজার পিয়ের আকিলিমালি জানান, নিয়াকুন্ডের মতো হামলাগুলো স্বাস্থ্যকর্মীদের মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, কর্মীরা একদিকে যেমন ভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন, তেমনি তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও চরম অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তবে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন আগের চেয়ে স্থিতিশীল হয়েছে এবং তারা সহযোগী সংস্থাগুলোকে দ্রুত ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন। এদিকে আফ্রিকা সিডিসি জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহেই তাদের বিশেষজ্ঞ দলগুলোকে পুনরায় কাজে মোতায়েন করা হতে পারে, যা এই সংকট মোকাবিলায় নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।











