নব্বইয়ের দশকের হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে আলোচিত এবং রহস্যময় অধ্যায়গুলোর একটি ছিল প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা রামগোপাল ভার্মা এবং তৎকালীন জনপ্রিয় অভিনেত্রী উর্মিলা মাতোন্ডকরের সম্পর্ক। পেশাগত সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে তাদের ব্যক্তিগত রসায়ন নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বলিপাড়ার অন্দরে নানা গুঞ্জন ও জল্পনা ছড়িয়ে ছিল। তবে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর সেই পুরোনো সম্পর্কের কথা সামনে এসেছে এক বিস্ফোরক দাবি নিয়ে, যা বিনোদনজগতে আবারও ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। সম্প্রতি এক প্রবীণ চিত্রসাংবাদিক দাবি করেছেন যে, তাদের প্রেমের সম্পর্কের চলাকালীন সময়েই রামগোপাল ভার্মা এবং উর্মিলা মাতোন্ডকর অত্যন্ত গোপনে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি সামনে এসেছে জনপ্রিয় ইউটিউবার সিদ্ধার্থ কান্নানের চ্যানেলে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে। প্রবীণ চলচ্চিত্র সাংবাদিক জ্যোতি ভেঙ্কটেশ এই সাক্ষাৎকারে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে এই গোপন বিয়ের বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি জানান, এই গোপন বিয়ের খবরটি তিনি প্রথম পেয়েছিলেন খোদ দক্ষিণী মেগাস্টার চিরঞ্জীবীর কাছ থেকে। স্মৃতিচারণ করে জ্যোতি ভেঙ্কটেশ বলেন, ‘জেন্টলম্যান’ সিনেমার সেটে যখন চিরঞ্জীবীর সঙ্গে তার দেখা হয়, তখন অভিনেতা তাকে অত্যন্ত অবাক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘জ্যোতি, একজন সাংবাদিক হিসেবে তুমি তো সব ধরনের খবরের ওপরই লেখো, কিন্তু রামগোপাল ভার্মার সঙ্গে উর্মিলার বিয়ের খবরটা কেন লিখলে না?’

মেগাস্টার চিরঞ্জীবীর মুখে এমন চমকপ্রদ কথা শুনে সাংবাদিক জ্যোতি ভেঙ্কটেশ চরম বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি জানতে চান, এই দাবির সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা ভিত্তি রয়েছে কি না। জবাবে চিরঞ্জীবী তাকে জানান, অন্ধ্রপ্রদেশের একটি মন্দিরে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাদের বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছিল। এমনকি সেই বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন যে পুরোহিত, তার মোবাইল নম্বরও সাংবাদিক জ্যোতি ভেঙ্কটেশকে প্রদান করেন চিরঞ্জীবী।

তবে সাংবাদিক হিসেবে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে খবরটি সংবাদপত্রে প্রকাশ করার আগে তিনি সরাসরি অভিনেত্রী উর্মিলা মাতোন্ডকরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করতে চান। জ্যোতি ভেঙ্কটেশের দাবি অনুযায়ী, ফোনে বিয়ের খবরের কথা শুনতেই উর্মিলা কান্নায় ভেঙে পড়েন। অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে অভিনেত্রী বলেন, ‘আপনি আমার সম্পর্কে এমন খবর কীভাবে লিখতে পারেন? আমি যখন থেকে এই ইন্ডাস্ট্রিতে পা রেখেছি, তখন থেকেই তো আপনি আমাকে চেনেন এবং জানেন।’ অন্যদিকে, এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে রামগোপাল ভার্মা বরাবরের মতোই রহস্যময় থেকে যান এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তিনি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না।

সাক্ষাৎকারে তাদের বিচ্ছেদের পেছনের সম্ভাব্য কারণ নিয়েও আলোকপাত করেছেন জ্যোতি ভেঙ্কটেশ। তার ভাষ্যমতে, উর্মিলা মাতোন্ডকর রামগোপাল ভার্মার সঙ্গে কেবল গোপন সম্পর্ক নয়, বরং আইনি ও সামাজিকভাবে একটি স্থায়ী বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সময়ে রামগোপাল ভার্মা সাংসারিক দায়িত্ব নিতে বা তেমন কোনো বড় পদক্ষেপ নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না। আর এই মৌলিক মতপার্থক্য এবং সম্পর্কের অনিশ্চয়তার কারণেই শেষ পর্যন্ত তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ইতি ঘটে।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত রামগোপাল ভার্মা এবং উর্মিলা মাতোন্ডকর একসঙ্গে বেশ কয়েকটি কালজয়ী ও ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। ‘রঙ্গিলা’, ‘দৌড়’, ‘সত্যা’ এবং ‘প্যায়ার তুনে ক্যায়া কিয়া’-এর মতো দর্শকনন্দিত সিনেমাগুলো তাদের অসাধারণ সৃজনশীল রসায়নের হাত ধরেই পূর্ণতা পেয়েছিল। পেশাগত সাফল্যের তুঙ্গে থাকার সময়ই তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে গুঞ্জন জোরালো হয়ে ওঠে। তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, তাদের সম্পর্ক কেবল কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, যার প্রভাব পরবর্তীতে রামগোপাল ভার্মার সঙ্গে তার তৎকালীন স্ত্রী রত্না ভার্মার সম্পর্কের ওপরও পড়েছিল।

পরবর্তীতে নিজের আত্মজীবনী ‘গানস অ্যান্ড থাইস: দ্য স্টোরি অব মাই লাইফ’-এ উর্মিলার প্রতি তার মুগ্ধতার কথা খোলামেলাভাবেই স্বীকার করেছিলেন রামগোপাল ভার্মা। বইটির ‘উইমেন ইন মাই লাইফ’ নামের একটি বিশেষ অধ্যায় তিনি উৎসর্গ করেছিলেন উর্মিলার নামে। সেখানে আরজিবি লিখেছিলেন যে, উর্মিলার অপরূপ সৌন্দর্য এবং ব্যক্তিত্ব তাকে গভীরভাবে মোহাবিষ্ট করেছিল এবং সেই বিশেষ মুগ্ধতা থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়ে তিনি ‘রঙ্গিলা’ চলচ্চিত্রে উর্মিলাকে মুখ্য চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছিলেন। যদিও বিয়ের দাবিটি নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে, তবে তাদের পেশাগত এবং ব্যক্তিগত টান বলিপাড়ার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।