অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে ক্যাম্পবেল থম্পসন এখনো খুব পরিচিত বা প্রতিষ্ঠিত নাম নন। জাতীয় দলের জার্সিতে নামার কোনো অভিজ্ঞতা তাঁর নেই, এমনকি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও খেলেছেন মাত্র একটি ম্যাচ। তবে ডারউইনে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে তিনি যে তাণ্ডব চালিয়েছেন, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য এবং আতঙ্কজনক। তিন দিনের এই প্রস্তুতি ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ২৫ রান খরচ করে বাংলাদেশের ৮টি উইকেট শিকার করেছেন এই ২২ বছর বয়সী বাঁহাতি পেসার। তাঁর বিধ্বংসী বোলিংয়ের সামনে সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়ে বাংলাদেশ দল, যার ফলে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে যায় তাদের দ্বিতীয় ইনিংস। শেষ পর্যন্ত ইনিংস ও ৩৮ রানের বড় ব্যবধানে পরাজয়ের মুখ দেখতে হয় টাইগারদের।
থম্পসনকে হয়তো গতির ঝড় তোলা কোনো এক্সপ্রেস পেসার বলা যাবে না, তবে তাঁর মূল শক্তি হলো অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত বোলিং, নিখুঁত সুইং এবং ধারাবাহিকভাবে স্টাম্প লক্ষ্য করে বল করা। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে এই কৌশলটিই তিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছেন। নতুন বলে বল সুইং করানোর পাশাপাশি স্টাম্প বরাবর আক্রমণাত্মক লাইন ধরে রেখেছিলেন তিনি, যার ফলে একের পর এক ব্যাটসম্যান তাঁর শিকার হয়েছেন। দ্বিতীয় ইনিংসে অমিত হাসান ও মেহেদী হাসান মিরাজ ছাড়া বাকি সবাইকে আউট করেছেন এই তরুণ পেসার। সৌম্য সরকার, মুশফিকুর রহিম ও নাজমুল হোসেনের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররাও তাঁর সামনে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। বাংলাদেশের হয়ে কেবল ওপেনার তানজিদ হাসান দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে সক্ষম হন, তিনি করেন ২২ রান। থম্পসনের পাশাপাশি কোরি রোচিচ্চিওলি দুটি উইকেট না নিলে বাংলাদেশের ইনিংস আরও করুণভাবে শেষ হতে পারত।
নিজের এই অভাবনীয় সাফল্যের পর বিনয়ী ছিলেন থম্পসন। ম্যাচ শেষে তিনি জানান, কখনো কখনো ভাগ্যও সহায় হয়। তবে তাঁর এই ৮ উইকেট যে কেবল ভাগ্যের খেলা নয়, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর সুনিপুণ বোলিং পরিকল্পনা ও তার সফল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের বিপক্ষে নামার আগে নতুন বল হাতে কী করতে হবে এবং কীভাবে ব্যাটসম্যানদের চাপে ফেলতে হবে, তা তাঁর কাছে একদম পরিষ্কার ছিল। থম্পসনের ভাষায়, বল সুইং করানো এবং সরাসরি স্টাম্পে আঘাত করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
গত মৌসুমে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর। তার আগে প্রাইম মিনিস্টার্স একাদশের হয়ে ইংল্যান্ড লায়ন্সের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। সেই ম্যাচে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটারদের বিপক্ষে লড়াই করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি, যা তাঁর আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এরপর দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ওয়ানডে কাপ ও শেফিল্ড শিল্ডে নিয়মিত খেলার সুযোগ পান থম্পসন। বিশেষ করে শেফিল্ড শিল্ডে উসমান খাজার মতো বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানকেও বেশ ভুগিয়েছেন তিনি। তবে গত মৌসুমে চোট তাঁর ক্যারিয়ারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ওয়ানডে কাপের একটি ম্যাচে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেয়ে প্রায় এক মাস তাঁকে পুনর্বাসনে থাকতে হয়। এরপর কঠোর পরিশ্রম ও প্রাক্-মৌসুম প্রস্তুতির মাধ্যমে তিনি পুনরায় মাঠে ফেরেন।
বাংলাদেশের বিপক্ষে ৮ উইকেট পাওয়ার পর ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি বড় কোনো পরিকল্পনা করছেন না থম্পসন; বরং ধাপে ধাপে নিজের উন্নতির দিকে নজর দিতে চান এই তরুণ পেসার। তবে বাংলাদেশের জন্য এই পারফরম্যান্স একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। আগামী ১৩ আগস্ট ডারউইনে শুরু হবে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচ। সেখানে বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউডের মতো বিশ্বমানের পেসাররা। প্রস্তুতি ম্যাচে একজন অনভিজ্ঞ পেসারের কাছে যেভাবে অসহায় হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ, তাতে মূল সিরিজের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা তাদের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে।











