হোয়াইট হাউস থেকে নতুন চমক হিসেবে চালু করা হয়েছে ‘ট্রাম্প টিভি’ নামক একটি নিজস্ব স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় এই চ্যানেলের আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার যাত্রা শুরু হয়। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে জানানো হয়েছে যে, ‘ট্রাম্প টিভি’ এখন থেকে সরাসরি সম্প্রচারে যোগ দিয়েছে। এটি একটি ২৪ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে সাত দিন সচল থাকার কথা এবং নিয়মিতভাবে নতুন কন্টেন্ট দিয়ে আপডেট করা হবে।

চ্যানেলটি চালু হওয়ার পরপরই এতে গত ৩ জুলাই মাউন্ট রাশমোরে দেওয়া ট্রাম্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের আর্কাইভ ভিডিও প্রদর্শিত হতে দেখা যায়। মূলত এই প্ল্যাটফর্মটিতে ট্রাম্পের পূর্ববর্তী বিভিন্ন জনসম্মুখে উপস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ এবং ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোর ভিডিও সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে এই নতুন চ্যানেলের যাত্রা শুরু হলো হোয়াইট হাউসের সঙ্গে দেশটির বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তীব্র বিরোধের এক উত্তপ্ত সময়ে। গত শুক্রবারই ট্রাম্প সিএনএন (CNN), এমএস নাও (MS Now) এবং পলিটিকোকে (Politico) হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেন। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সংবাদমাধ্যম তিনটি দ্রুত আদালতের দ্বারস্থ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয় এবং তাদের প্রেস পাস বা সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র জব্দ করা হয়।

এই ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম—এবিসি (ABC), সিবিএস (CBS), সিএনএন (CNN), ফক্স (Fox) ও এনবিসি (NBC)—সম্মিলিতভাবে হোয়াইট হাউসের ‘পুল’ কভারেজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। একটি যৌথ বিবৃতিতে তারা স্পষ্ট জানায় যে, সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নির্ভুল ও নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়া জনগণের মৌলিক অধিকার এবং তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রশাসনের পছন্দ না হলেই তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। উল্লেখ্য, ‘পুল কভারেজ’-এর মাধ্যমে সাধারণত একটি বা একাধিক নির্বাচিত সংবাদমাধ্যম হোয়াইট হাউসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর ভিডিও ধারণ করে, যা পরে অন্যান্য টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ব্যবহার করতে পারে।

সোমবার হোয়াইট হাউসের নির্ধারিত টিভি পুল হিসেবে সিএনএনের কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু এই চরম বিরোধের কারণে ট্রাম্পের নতুন হেলিপ্যাড উদ্বোধন এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো সাধারণ টেলিভিশন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়নি। সাউথ লনে নির্মিত গ্রানাইট হেলিপ্যাডটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি কেবল হোয়াইট হাউসের নিজস্ব ওয়েবসাইটে সরাসরি দেখা গেলেও, সেখানে ট্রাম্পের বক্তব্যের অডিও বা শব্দ স্পষ্ট ছিল না। শুধু তাই নয়, হোয়াইট হাউসে কর্মরত এএফপি-সহ বেশ কিছু ফটো সাংবাদিকও নিষিদ্ধ তিন সংবাদমাধ্যমের প্রতি সংহতি জানিয়ে হেলিপ্যাডের ছবি প্রকাশে বিলম্ব করার সিদ্ধান্ত নেন।

সংবাদমাধ্যম নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান বরাবরই আক্রমণাত্মক। তিনি সংবাদমাধ্যমগুলোকে ‘ক্যান্সার’ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ তিনি দাবি করেন, “হোয়াইট হাউস স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর কোনো আক্রমণ চালাচ্ছে না; বরং ভুয়া সংবাদ বা ফেক নিউজ প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে।” ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এই অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে বামপন্থি প্রচারণা চালানোর অভিযোগ তোলেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “এসব প্রতিষ্ঠান সংবাদ প্রকাশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারবে ঠিকই, কিন্তু হোয়াইট হাউসে তাদের আর কোনো অফিস বা কাজের সুযোগ থাকবে না।”

নিষিদ্ধ হওয়া তিন সংবাদমাধ্যমের দায়ের করা মামলায় দাবি করা হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে বর্ণিত মুক্ত সংবাদমাধ্যমের অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। আদালত আগামী বুধবার এই মামলার শুনানি গ্রহণ করতে পারে। শুক্রবার নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, গত দুই বছরের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের কারণেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যদিও তিনি এর বিস্তারিত কারণ ব্যাখ্যা করেননি। একইসঙ্গে তিনি অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্যও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই তার নির্বাচনী প্রচার ও প্রশাসনের সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশকারী সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছেন এবং তাদের ‘জনগণের শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে এই সংকট এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে যখন ট্রাম্পের জনসমর্থন রেকর্ড অনুযায়ী সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে।