সময়ের সদ্ব্যবহার: মুমিনের জীবন ও পরকালীন সফলতার মূলমন্ত্র
মহান আল্লাহ তাআলার দেওয়া শ্রেষ্ঠতম নেয়ামতগুলোর মধ্যে মানবজীবন এবং সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এই সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষকে প্রেরিত করা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং নির্ধারিত সময়সীমার জন্য। জন্মের পূর্বেই মহান সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেক মানুষের জীবনকাল নির্ধারণ করে রেখেছেন, যা কোনোভাবেই পরিবর্তনযোগ্য নয়। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই মানুষকে তার জীবন অতিবাহিত করতে হয়, অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হয় এবং নানাবিধ কর্মের মাধ্যমে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করতে হয়। তবে এই নির্ধারিত সময়সীমা এক মুহূর্তের জন্যও আগে-পরে হয় না কিংবা কমবেশি হয় না। যার জন্য যতটুকু সময় বরাদ্দ, সেই সময় শেষ হয়ে গেলেই তার পার্থিব জীবনের অবসান ঘটে এবং সে অনন্ত পরকালের যাত্রায় পা রাখে। তাই একজন প্রকৃত মুমিন সর্বদা এই বিষয়ে সচেতন থাকেন যে, তার জীবন অত্যন্ত সীমিত এবং প্রতিটি মুহূর্ত অমূল্য। এই গভীর উপলব্ধি মানুষকে সৎকর্মে উৎসাহিত করে, পাপ ও অন্যায় থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। এই বিষয়ে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে ইরশাদ করেছেন, ‘কিন্তু যখন কারো নির্ধারিত সময়কাল উপস্থিত হবে তখন আল্লাহ তাকে কিছুতেই অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কিছুই করো আল্লাহ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা মুনাফিকুন, আয়াত: ১১)।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জবাবদিহিতা
পার্থিব জীবনে মানুষের জন্য যে নির্দিষ্ট সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে, তার প্রতিটি মুহূর্তের জন্য তাকে মহান আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। মানুষ পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করলেও তার প্রতিটি কাজ, কথা, চিন্তা এবং সময়ের ব্যবহারের পূর্ণ জ্ঞান আল্লাহর কাছে রয়েছে। কিয়ামতের কঠিন দিনে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষকে জিজ্ঞাসা করবেন—সে তার জীবনকাল কীভাবে অতিবাহিত করেছে? আল্লাহর দেওয়া সুযোগ-সুবিধাগুলো কতটুকু সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছে? এবং নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সে কতটুকু সচেষ্ট ছিল? সময়ের অসীম মূল্য ও তাৎপর্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে মহান আল্লাহ সময়ের শপথ করে বলেছেন, ‘শপথ মহাকালের, মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।’ (সুরা আসর, আয়াত: ১-৩)। এই শপথের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সময়ের সঠিক ব্যবহারই পারে মানুষকে প্রকৃত সফলতা এনে দিতে, অন্যথায় মানুষ চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
সময়ের অপচয় ও পরকালীন অনুশোচনা
ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থবহ এবং কল্যাণকর কাজে ব্যয় করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। তবে পার্থিব জীবনের মোহে মানুষ প্রায়ই মনে করে যে, তার হাতে এখনো প্রচুর সময় রয়েছে। ফলে সে ইবাদত, আল্লাহর স্মরণ, নেক আমল, জ্ঞানার্জন এবং মানবকল্যাণমূলক কাজগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য পিছিয়ে দেয়। কিন্তু যখন আখিরাতের কঠোর বাস্তবতা তার সামনে উন্মোচিত হবে এবং সে তার আমলনামা প্রত্যক্ষ করবে, তখন সে উপলব্ধি করবে যে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আসলে কতটা অমূল্য ছিল। তখন সে দেখবে, যে সময়গুলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কাজে ব্যয় করা হয়েছে, সেগুলোই তার জন্য একমাত্র কল্যাণ ও সফলতার পাথেয়। অন্যদিকে, যে সময়গুলো বৃথা নষ্ট করা হয়েছে, সেগুলোই হবে তার চরম অনুশোচনার কারণ। এই প্রসঙ্গে মুআজ ইবনু জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতবাসীরা পৃথিবীর কোনো কিছুর জন্য আফসোস করবে না; তবে তারা আফসোস করবে শুধু সেই সময়ের জন্য, যা তারা আল্লাহর স্মরণ ছাড়া অতিবাহিত করেছে।’ (আল-মুজামুল কাবির, হাদিস: ১৮২; শুআবুল ঈমান, হাদিস: ১০৫৭)।
মুমিনের জীবন ও অসার কাজ বর্জন
একজন মুমিনের জীবন কখনোই উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন কিংবা অনর্থক কর্মকাণ্ডে পরিপূর্ণ হতে পারে না। কারণ সে বিশ্বাস করে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর দেওয়া এক মূল্যবান আমানত এবং এর প্রতিটি অংশের হিসাব একদিন মহান রবের দরবারে দিতে হবে। তাই ঈমানদার ব্যক্তি সর্বদা এমন কথা ও কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখে, যা দুনিয়া ও আখিরাতের কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। মহান আল্লাহ মুমিনদের সফলতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন, ‘অবশ্যই সফল হয়েছে মুমিনরা; যারা তাদের সালাতে বিনয়ী ও একাগ্র থাকে এবং যারা অসার ও অনর্থক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা আল-মুমিনুন, আয়াত: ১-৩)। এছাড়া আল্লাহ তাআলা তাঁর নেককার বান্দাদের গুণাবলি বর্ণনা করে আরও বলেন, ‘আর তারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং যখন তারা অসার কর্মকাণ্ডের সম্মুখীন হয়, তখন মর্যাদার সঙ্গে তা পরিহার করে চলে।’ (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭২)। এই বিষয়ে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য ও উৎকর্ষের অন্যতম নিদর্শন হলো, সে অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় পরিহার করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭; ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৩৯৭৬)।
প্রযুক্তির যুগে সময়ের অপচয় ও সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা
বর্তমান যুগে মানুষের জীবনকে সহজ, সুন্দর ও গতিশীল করার জন্য প্রতিনিয়ত আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। এসব আধুনিক যন্ত্রপাতির মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের শ্রম কমানো, কাজের গতি বৃদ্ধি করা এবং মূল্যবান সময় সাশ্রয় করা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে প্রযুক্তি আমাদের সময় বাঁচানোর জন্য সৃষ্টি হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রযুক্তির মাধ্যমেই অজান্তে জীবনের অমূল্য সময় অপচয় হচ্ছে। বিশেষ করে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজকের তরুণ প্রজন্মের জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রয়োজনীয় যোগাযোগ, শিক্ষা এবং তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম হলেও এর অপব্যবহার মারাত্মক। বাস্তবতা হলো, অসংখ্য মানুষ দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোনের পর্দায় ডুবে থেকে মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। কোনো বিশেষ প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও তারা অবিরাম স্ক্রল করে চলেছে; এক ভিডিও থেকে অন্য ভিডিওতে, এক পোস্ট থেকে অন্য পোস্টে ছুটে বেড়াচ্ছে। অনেকের অবস্থা এমন যে, চলার পথে, যানবাহনে, এমনকি পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশেও তারা মোবাইল ফোন ও হেডফোনের এক কৃত্রিম জগতে বন্দি হয়ে থাকে। এর ফলে সময়ের পাশাপাশি মানুষের মনোযোগ, চিন্তাশক্তি এবং পারিবারিক বন্ধন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সময়ের মূল্য সম্পর্কে উম্মতকে গভীরভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে বেশির ভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা ও অবসর সময়।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)।
সময়ের মূল্যায়নের অনন্য দৃষ্টান্ত
সময়ের মূল্যায়নের এক অনন্য ও অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে। বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোমরা এমন জান্নাতের দিকে এগিয়ে চলো, যার বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর চেয়েও ব্যাপক।’ এই কথা শুনে উমাইর ইবনু হামাম (রা.) বিস্ময় ও আনন্দে বলে উঠলেন, ‘বাহ! বাহ!’ রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কেন এ কথা বললে?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি আশা করি, আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত।’ তখন উমাইর (রা.) তাঁর থলি থেকে কিছু খেজুর বের করে খেতে শুরু করলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মনে হলো, এই সামান্য খেজুরগুলো শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাও তো অনেক দীর্ঘ সময়! পরকালের অনন্ত সুখের সামনে এই সামান্য মুহূর্ত অতিবাহিত করাও যেন তাঁর কাছে দীর্ঘ মনে হলো। এরপর তিনি সাথে সাথে খেজুরগুলো ফেলে দিয়ে তরবারি হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করলেন। (মুসলিম, হাদিস: ১৯০১)।
পরিশেষে বলা যায়, মানুষের জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর গুরুত্ব অপরিসীম। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি আমানত, যার সঠিক ব্যবহারই মানুষের প্রকৃত সফলতার চাবিকাঠি। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত সময়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করা, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকা। কারণ হারিয়ে যাওয়া সময় আর কখনো ফিরে আসে না, রয়ে যায় কেবল তার কাজের প্রতিদান।








