মানুষের মন এক রহস্যময় ও বিচিত্র জগৎ। যেখানে যুক্তির আলো পৌঁছায় না, সেখানে মানুষ নিজেই কল্পনার প্রদীপ জ্বালিয়ে নেয়। আর সেই কল্পিত আলো কখনো কখনো পথ দেখানোর বদলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে ভুল পথে পরিচালিত করে। ইসলাম-পূর্ব আরবের তপ্ত মরুপ্রান্তরে, যেখানে জীবন ছিল অনিশ্চয়তা আর কঠোরতায় ঘেরা, সেখানে এমনই এক ভ্রান্ত কল্পনার জন্ম হয়েছিল সফর মাসকে কেন্দ্র করে। আরবি ক্যালেন্ডারের দ্বিতীয় মাস এই সফর, যা জাহেলি যুগের মানুষের কাছে ছিল অশুভ, অকল্যাণকর, রোগব্যাধি ও দুর্ভাগ্যের এক চরম প্রতীক।

কুসংস্কারের শিকড় এবং জাহেলি বিশ্বাস
জাহেলি আরবরা অন্ধবিশ্বাসে বিশ্বাস করত যে, সফর মাসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে সংসারে অশান্তি ও অকল্যাণ নেমে আসে, এই মাসে ভ্রমণে বের হলে বড় ধরনের বিপদ ঘটে এবং এই মাসে জন্ম নেওয়া সন্তান হয় দুর্ভাগ্যের বাহক। তাদের বিশ্বাস এতটাই অদ্ভুত ছিল যে, কেউ কেউ মনে করত সফর মাসেই সাপের পেটে এক বিশেষ ধরণের কীট জন্মায়, যা মানুষের ক্ষুধা-পীড়া ও শারীরিক অসুস্থতার প্রধান কারণ। তাই এই মাসটিকে রোগের মাস হিসেবেও গণ্য করা হতো। অন্ধ বিশ্বাসের এই জাল এতটাই গভীর ছিল যে, মানুষ প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম, নিজের কর্মফল এবং স্রষ্টার অকাট্য বিধান ভুলে গিয়ে একটি মাসের নামের মধ্যেই ভাগ্যের নিয়ন্তা খুঁজে বেড়াত। অথচ কোনো মাস, দিন বা সময় নিজে থেকে শুভ বা অশুভ হতে পারে না—এই সহজ ও মৌলিক সত্যটিই তারা পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিল।

কোরআনের আলোকে শুভ-অশুভ ও ভাগ্যের ধারণা
জীবনের প্রতিটি বাঁকে যা কিছু ঘটে, তার চূড়ান্ত নিয়ন্তা একমাত্র আল্লাহ—এই অটুট বিশ্বাসই একজন মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি বয়ে আনে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘বলুন, আমাদের ওপর কেবল তা-ই আপতিত হবে, যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর মুমিনদের উচিত আল্লাহর ওপরই তাওয়াক্কুল করা’ (সুরা আত-তওবা-৫১)। এই একটি বাক্যই মুমিনের কাঁধ থেকে অনিশ্চয়তার পাহাড়সম বোঝা নামিয়ে দেয়। জীবনের অনিশ্চয়তার সমুদ্রে সে আর ভাসমান থাকে না, বরং তার হাতে ধরা থাকে ইমানের মজবুত নোঙর। আল্লাহ আরও ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই আপতিত হয় না। আর যে আল্লাহর প্রতি ইমান রাখে, তিনি তার হৃদয়কে সঠিক পথে পরিচালিত করেন’ (সুরা আত-তাগাবুন-১১)।

এই আয়াতগুলোর মর্মবাণী অত্যন্ত স্পষ্ট—ভাগ্য নির্ধারিত হয় একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছায়, কোনো মাসের নামে বা তথাকথিত কুলক্ষণে নয়। একজন মুমিনের প্রধান কর্তব্য হলো তাওয়াক্কুল, অর্থাৎ সর্বোচ্চ চেষ্টার পর ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া। ভয়ের বশে কল্পিত অশুভ শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।

হাদিসের সুস্পষ্ট ঘোষণা ও কুসংস্কারের বিলুপ্তি
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবন ও শিক্ষার মাধ্যমে সব ধরণের কুসংস্কারের মূলে কঠোর আঘাত হেনেছেন। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক বাক্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রোগের নিজস্ব কোনো সংক্রামক ক্ষমতা নেই (আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া), পাখি উড়িয়ে শুভ-অশুভ নির্ণয় করার কোনো ভিত্তি নেই এবং সফর মাস বলে কিছু অশুভ নয়। এই একটি ঘোষণার মাধ্যমেই জাহেলি যুগের শত শত বছরের কুসংস্কারের ভিত ভেঙে পড়ে।

তিনি আরও শিখিয়েছেন যে, কোনো কিছুতেই অশুভ লক্ষণ নেই; বরং মুমিনের উচিত সর্বদা আল্লাহর প্রতি শুভ প্রত্যাশা পোষণ করা। অন্য এক বর্ণনায় তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি কুলক্ষণে বিশ্বাস করে নিজের প্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকে, সে যেন শিরকের নিকটবর্তী হলো (মুসনাদে আহমাদ)। এই কঠোর সতর্কবাণী থেকে বোঝা যায়, ইসলাম কুসংস্কারকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং একে ইমানের পরিপন্থী মনে করে।

সমাজে প্রচলিত প্রথা ও তার অসারতা
দুঃখজনক বিষয় হলো, দীর্ঘ ১৪০০ বছর পর আজও অনেক মুসলিম সমাজে সফর মাস নিয়ে নানা রকম অবাস্তব ও ভিত্তিহীন প্রতিকারের প্রচলন দেখা যায়। কেউ এই মাসের শেষ বুধবারকে ‘আখেরি চাহারশোম্বা’ নামে বিশেষ ইবাদত বা উৎসবের দিন মনে করেন। কেউ বিশেষ নামাজ বা দান-সদকার মাধ্যমে তথাকথিত ‘সফরের অনিষ্ট’ থেকে বাঁচার চেষ্টা করেন। আবার অনেকে এই মাসে বিয়েশাদি বা নতুন কোনো ব্যবসায়িক কাজ শুরু করা থেকে বিরত থাকেন।

অথচ এসব প্রথার কোনোটিই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী বা তাঁর সাহাবিদের আমলের ইতিহাসে পাওয়া যায় না। বরং ইতিহাস সাক্ষী দেয়, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে সফর মাসেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে বের হয়েছেন এবং এই মাসে বিবাহ বা অন্য কোনো কাজ সম্পাদনে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেননি। মানুষের ভয় যখন জ্ঞানের সীমানাকে অতিক্রম করে যায়, তখনই জন্ম নেয় কুসংস্কার। সফর মাস নিয়ে প্রচলিত ভীতি আসলে অজ্ঞতারই এক ফসল, যাকে ইসলাম অনেক আগেই মূলোৎপাটন করেছে। প্রকৃত মুমিনের হৃদয়ে কোনো মাস, কোনো সংখ্যা বা কোনো লক্ষণ ভয়ের কারণ হতে পারে না। তাই আমাদের উচিত কল্পনার কুয়াশা সরিয়ে ইমানের আলোয় প্রতিটি দিন ও প্রতিটি মাসকে স্বাগত জানানো।