আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে দশম শ্রেণি পর্যন্ত দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নভোথিয়েটারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর প্লেনারি সেশনে এই ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুত পরিবর্তনশীল বর্তমান বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন উপদেষ্টা। তিনি জানান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত—যাকে সংক্ষেপে 'স্টেম' (STEM) শিক্ষা বলা হয়—তা এখন শুধু মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং উচ্চশিক্ষা পর্যায়েও একে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌক্তিক চিন্তা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
কারিকুলাম সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রাথমিক স্তরেও নতুন কিছু সংযোজন করা হচ্ছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্পোর্টস’ (খেলাধুলা) ও ‘কালচার’ (সংস্কৃতি) নামে দুটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যা শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক হবে। অন্যদিকে, ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা 'সুখের সাথে শিক্ষা' শীর্ষক একটি বিশেষ বিষয় চালু করা হচ্ছে। এই বিষয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় ইন্টারপারসোনাল স্কিল বা আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ দক্ষতা এবং ট্রান্সফারেবল স্কিল বা স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতাগুলোর উন্নয়ন ঘটানো, যাতে তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে যেতে পারে।
কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাহদী আমিন বলেন, বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা সব শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়, যা একটি সীমাবদ্ধতা। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং ধাপে ধাপে তা দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, উন্নত দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থার আদলে কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার বাইরে কোনো আলাদা বা বিকল্প বিষয় হিসেবে না দেখে বরং একে মূলধারার শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশি তরুণদের মেধা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের সক্ষমতার বিষয়ে দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, উপযুক্ত সুযোগ, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং প্রয়োজনীয় প্ল্যাটফর্ম প্রদান করা গেলে দেশের তরুণ প্রজন্ম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে দেশের শিক্ষা ও শিল্প খাতের উন্নয়নে কাজে লাগানোর একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এই প্রক্রিয়ায় দেশীয় অ্যালামনাইদের এনডাউমেন্ট ফান্ড, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) ফান্ড এবং বিশেষজ্ঞদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি মজবুত সেতুবন্ধন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া, বিশেষ ফেলোশিপের মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের দেশের কারিকুলাম প্রণয়ন এবং শিল্প খাতের আধুনিকায়নে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
‘স্টেম ফর অ্যা ফিচার-রেডি বাংলাদেশ: বিল্ডিং দ্য ব্যাকবোন অব দ্য ইনোভেটিভ ইকোনোমি’ শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। সেমিনারে আরও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের শিক্ষা প্রধান এস কিয়াং কো, দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তানভীর মোহাম্মদ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম।


















