দেশের বর্তমান জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং তীব্র গ্যাসসংকট নিরসনে মালয়েশিয়া সরকারের বিশেষ সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই লক্ষ্যেই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোনিক আলাপচারিতায় অংশ নিয়েছেন তিনি। আলাপচারিতার পাশাপাশি সংকটের গুরুত্ব এবং এর প্রভাব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক পত্রও পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি (লিকুইফাইড ন্যাচরাল গ্যাস) আমদানিসহ জ্বালানি খাতের সার্বিক উন্নয়নে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বর্তমান পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরে বলেন, ‘বর্তমানে দেশে চলমান গ্যাসসংকটের কারণে সাধারণ মানুষ চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে গৃহস্থালি পর্যায়ে নারী, শিল্প খাতের উদ্যোক্তা এবং গণপরিবহনের যাত্রীরা যে তীব্র দুর্ভোগের সম্মুখীন হয়েছেন, তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে গভীর দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। সরকার এই সংকট দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’

দেশের গ্যাসের চাহিদার উৎস এবং বর্তমান সংকটের কারিগরি কারণ ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদা মূলত দুটি প্রধান উৎস থেকে পূরণ করা হয়। প্রথমটি হলো দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং দ্বিতীয়টি হলো আমদানি করা এলএনজি। এই আমদানি করা এলএনজি এফএসআরইউ (Floating Storage Regasification Unit) বা ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে রিগ্যাসিফাই করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। তবে গত সপ্তাহে একটি এফএসআরইউ-তে বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি ও দুর্ঘটনার ফলে সেটির মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাতীয় গ্রিডে এবং গত কয়েক দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হয়েছে। এর ফলে আবাসিক এলাকা, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং গণপরিবহন—সব খাতেই তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।

এই কারিগরি ত্রুটি সমাধানে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, এফএসআরইউ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘এক্সেলারেট এনার্জি’র সঙ্গে জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা এবং আরপিজিসিএল সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। দেশি এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল এই জটিল সমস্যা সমাধানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি আরও জানান, আজ সকালে এক্সিলারেট এনার্জির এ অঞ্চলের প্রধান কর্মকর্তা ও ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের বর্তমান সংকট এবং সরকারের গভীর উদ্বেগের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকেও পরিস্থিতি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দ্রুত সমস্যা সমাধানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

ত্রুটিগ্রস্ত এফএসআরইউ-এর বর্তমান অবস্থা ও পুনরুদ্ধারের সময়সীমা সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী জানান, স্বাভাবিক অবস্থায় এই টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। আশা করা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকে এখান থেকে অন্তত ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এবং পরবর্তী সপ্তাহের শেষ নাগাদ এফএসআরইউ-টি পুরোপুরি সচল হয়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মালয়েশিয়ার সহযোগিতার বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সংকটের গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত সোমবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টায় দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে ফোনে কথা হয়েছে। এই আলাপচারিতার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় মালয়েশিয়ার কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন।’ তিনি আরও জানান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম আশ্বস্ত করেছেন যে, সংকট নিরসনে তার এবং তার দেশের পক্ষ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা করা সম্ভব, তা সংশ্লিষ্ট টিম ও মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা করে খুব দ্রুত জানানো হবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আমদানির সুযোগ তৈরির বিষয়ে কাজ চলছে। তবে এই সহযোগিতা কেবল এলএনজি আমদানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, কারিগরি পরামর্শ এবং অন্যান্য সম্পদ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতার সুযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার জ্বালানির বিকল্প উৎস খোঁজার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। হাতে যত বেশি বিকল্প উৎস থাকবে, ভবিষ্যতে কোনো একটি উৎসে সমস্যা দেখা দিলে অন্য উৎস থেকে ঘাটতি পূরণ করা সহজ হবে। বর্তমানে বিকল্পের সংখ্যা সীমিত থাকায় একটি এফএসআরইউ-তে সমস্যা দেখা দেওয়ায় পুরো দেশ সংকটে পড়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এফএসআরইউ-এর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণই হবে এই সমস্যার মূল সমাধান। এই বৃহৎ প্রকল্পের জন্য জাপানের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে। সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার সঙ্গে এনার্জি কোঅপারেশন বা জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার সহযোগিতার সুফল কবে নাগাদ পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়া সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতার ধরন ও সময়সীমা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পরই তা জানানো সম্ভব হবে। তবে এখন পর্যন্ত আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক হয়েছে। পরিশেষে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘জনগণের এই কষ্ট আমাদেরও ব্যথিত করছে। জনগণ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাদের দুর্ভোগ নিরসনের জন্য। তাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা এবং আরপিজিসিএল দিনরাত এক করে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন এবং সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণ করছেন।’