ফেনী জেলার দীর্ঘদিনের বন্যাকবলিত এলাকাগুলোকে সুরক্ষিত করতে এবং জনজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মুহুরী-কহুয়া বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। তিনি জানান, ২০২৪ সালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যায় ফেনীর সাধারণ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা এই অঞ্চলের কৃষি ও জনজীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ফেনীর মানুষকে স্থায়ীভাবে বন্যামুক্ত রাখতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই মেগা প্রকল্পটি একনেক (ECNEC)-এর মাধ্যমে দ্রুত অনুমোদন দিয়েছেন।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় ফেনীর পরশুরামে সুবার বাজার পরশুরাম সড়কের স্টিল ব্রিজ সংলগ্ন স্থানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে নির্মাণাধীন সভাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি অত্যন্ত আশাবাদের সাথে জানান, এই প্রকল্পটির যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত হলে এই এলাকার মানুষ আগামী ১০০ বছর পর্যন্ত বন্যার ভয়াবহ ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে। এর ফলে এই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং মৎস্য চাষের ক্ষেত্রে শত বছরের দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা ভোগ করতে পারবেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়ে কথা বলে প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের আমলে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনোভাবেই চুরি ও দুর্নীতি হতে দেওয়া হবে না। এই সরকার জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার, তাই জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা অপরিসীম।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিটি কাজ অত্যন্ত সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম করা হচ্ছে না। পানিসম্পদ মন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে সকল প্রকল্প তদারকি করছেন যাতে কাজের গুণগত মান বজায় থাকে।

স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সজাগ থাকতে হবে। বাঁধ নির্মাণকাজে ঠিকাদারের কোনো ধরনের অনিয়ম বা কারচুপি পরিলক্ষিত হলে যেন সাথে সাথে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করা হয়। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, মুহুরী-কহুয়া বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের মহাপরিকল্পনার কাজ আগামী ১ অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। এটি সরকারের একটি নির্বাচনি অঙ্গীকার এবং এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফেনীর উত্তরাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব হবে।

বিগত শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান তারেক রহমান সরকারের আমলে দেশে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি tolerated করা হবে না। বিগত ১৭ বছরের শাসনামলে কোনো জবাবদিহিতা ছিল না, যার ফলে দেশে ব্যাপক আকারে অনিয়ম-দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা দীর্ঘ সময় ধরে নিবিড় সমীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে এই প্রকল্পের নকশা প্রস্তুত করেছেন, যা বিগত সরকারের জবাবদিহিতার অভাবের কারণে সম্ভব হয়নি। এছাড়া ফেনী জেলা সম্পর্কে আবেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ফেনী আমাদের প্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মস্থান। এই এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাব।’

সংশ্লিষ্ট পরিদর্শন কর্মসূচিতে ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন, ফেনীর জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবউল করিম, পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার এবং পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতনু বড়ুয়া উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম সাফায়েত আক্তার নূর, থানার ওসি মো. আশরাফুল ইসলাম, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু তালেব, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল হালিম, সদস্য সচিব ইব্রাহিম থলিল মনি, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কাজী ইউসুফ মাহফুজ, বিআরডিবির চেয়ারম্যান আবু তালেব রিপনসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য যে, একনেকে অনুমোদিত ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যানিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন’ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জানা গেছে, ফেনী সফরের শুরুতে জেলার পরশুরামে ঘাটঘর এলাকায় মুহুরী নদীর বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করবেন সরকারপ্রধান। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং বাঁধের ভাঙনের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলো দূর হবে, যার সুফল পাবেন এই বৃহত্তর অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। প্রকল্পটির কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর আগে, গত ১৬ জুন একনেকে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকার ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যানিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ অনুমোদন দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ এবং ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন করা হবে। পাশাপাশি ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণ করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে মুহুরী-কহুয়া নদীতে নতুন বাঁধ নির্মাণ এবং সিলোনিয়া নদীতেও বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও বেশ কিছু জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের উদ্বোধন করবেন। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম ও পুরোহিতদের ভাতা প্রদান এবং ২৪৯ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার প্যানেল স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তার নানার বাড়ি ফুলগাজীর শ্রীপুরের মজুমদার বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন এবং পারিবারিক কবরস্থান জিয়ারত করবেন। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা প্রদান এবং রোগীদের জন্য বিনামূল্যে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসার বিশেষ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হবে। সফরকালে তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও স্থানীয় সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় করবেন এবং সবশেষে ফুলগাজী সরকারি হাইস্কুল মাঠে উপজেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন।