সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্রে দীর্ঘকাল ধরে যে উঁচু দেয়াল ও কারাগারের পরিবেশ নগরবাসীকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল, তা এবার ইতিহাস হয়ে যেতে যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেই বিশাল ভূখণ্ডে গড়ে উঠবে এক নান্দনিক ও আধুনিক বিনোদন পার্ক। শুধু তাই নয়, সেই একই স্থানে নির্মাণ করা হবে রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই প্রকল্পের জন্য বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের বিশাল জমিটি এখন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) কাছে হস্তান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এমপি। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শিল্প, বাণিজ্য ও বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। এছাড়াও সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, কারা মহাপরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামালসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সিলেট নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত এই এলাকাটি দীর্ঘ সময় ধরে কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। মূলত বাদাঘাটে কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণের সময় এই জায়গাটির একটি বড় অংশ পার্ক হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এবং পরিবর্তিত প্রয়োজনে এখানে পার্কের পরিবর্তে উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা একটি কারাগার হিসেবেই জায়গাটি ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। ফলে নগরবাসীর জন্য একটি উন্মুক্ত ও সবুজ পরিসর পাওয়ার স্বপ্নটি বহু বছর ধরে ঝুলে ছিল। এবার সেই বিশাল নগরভূমি উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখানে থাকবে সবুজের সমারোহ, হাঁটার পথ এবং নির্মল বাতাসের এক প্রশান্তিময় পরিবেশ।

নতুন এই পার্কটি কেবল একটি বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং সিলেটকে 'গ্রিন ও ক্লিন' এবং নান্দনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। নগরীর যান্ত্রিক ও ব্যস্ত জীবনে সাধারণ মানুষের জন্য এটি একটি শান্তির নীড় হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য, বয়স্কদের হাঁটার জন্য এবং পরিবার নিয়ে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর স্থান হিসেবে এই পার্কটি পরিচিতি পাবে। এটি নগরীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এই বিশাল পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শিল্প, বাণিজ্য ও বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি এবং সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর নিরলস প্রচেষ্টা। পুরোনো কারাগারের স্থানে এই নান্দনিক পার্ক নির্মাণের বিষয়টি এমপি খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। অন্যদিকে, সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও বিভিন্ন সময়ে নগরবাসীর জন্য একটি উন্মুক্ত ও সবুজ পরিসর তৈরির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন।

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মন্ত্রী ও সিটি প্রশাসক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বরাবর একটি আধা-সরকারি (ডিও) পত্র প্রদান করেন। এই পত্রের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটি সরেজমিনে এলাকাটি পরিদর্শন করে এবং সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় ও আইনি দিকগুলো পর্যালোচনা করে ভূমিটি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে একটি ইতিবাচক প্রতিবেদন প্রদান করে। এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন কেবল বাস্তবায়নের অপেক্ষা, যা সিলেট নগরীর মানচিত্র এবং জীবনযাত্রার মান বদলে দেবে।