সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং খাতে বিষাক্ত গ্যাসের ভয়াবহ ছোবলে শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা যেন এক অন্তহীন লাশের মিছিলে পরিণত হয়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় যখন পুরো শিল্পাঞ্চল জুড়ে স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ, আহাজারি আর মাতম চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মালিকপক্ষের অধিকাংশ সদস্য ও শীর্ষ নেতৃত্ব ঘটনাস্থল এবং শোকাহত পরিবারগুলোর কাছ থেকে রহস্যজনকভাবে দূরে রয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমন চরম সংকটে ও শোকের মুহূর্তে অসহায় পরিবারগুলোর পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী এফসিএ। নিহত শ্রমিকদের জানাজায় অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে শোকসন্তপ্ত স্বজনদের বাড়িতে গিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের খোঁজ নেওয়া এবং গভীর রাতে ঝুঁকিপূর্ণ দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন—প্রতিটি পদক্ষেপে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে। জানা গেছে, প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল টেস্ট এবং যথাযথ গ্যাসমুক্তকরণ সনদ ছাড়াই স্ক্র্যাপ জাহাজে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাটিংয়ের কাজ চালানো হচ্ছিল। এই চরম গাফিলতির সুযোগে জাহাজের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে একের পর এক শ্রমিক প্রাণ হারান এবং আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হন। এই আকস্মিক ও ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকায় নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই রাতে যখন নিহত শ্রমিকের মরদেহ পৌঁছায়, তখন শেষ বিদায়ের আয়োজনে কোনো দ্বিধা না করে দ্রুত ছুটে যান অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী। এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে স্থানীয় জনতা এবং স্বজনরা মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে জানাজার নামাজ আদায় করেন। কফিন ঘিরে স্বজনদের করুণ কান্নার মাঝে পাশে দাঁড়িয়ে তিনি গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং এই অকাল মৃত্যুর জন্য শোকাহতদের প্রতি সমবেদনা জানান।
জানাজা শেষে তিনি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং চিকিৎসাধীন আহত শ্রমিক এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলেন। সন্তানহারা মা, স্বামীহারা স্ত্রী কিংবা বাবাকে হারানো শিশুদের চোখের জল মুছে দিয়ে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি দৃঢ়ভাবে আশ্বাস দেন যে, এই কঠিন সময়ে তারা একা নন, তিনি এবং তার সহযোগীরা সবসময় তাদের পাশে থাকবেন। এরপর তিনি দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত শ্রমিকদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে তাদের নিবিড় ও সর্বোচ্চ চিকিৎসার অনুরোধ জানান।
রাত প্রায় ১১টার দিকে পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে এবং নিরাপত্তা খতিয়ে দেখতে অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী সরাসরি ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে যান। অন্ধকার ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে ইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থার চরম ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রীর অনুপস্থিতি তিনি প্রত্যক্ষ করেন। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের এই চরম গাফিলতির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি দুর্ঘটনার একটি নিরপেক্ষ আইনি তদন্তের দাবি জানান। একইসাথে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পূর্ণাঙ্গ ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবি উত্থাপন করেন তিনি।
এদিকে, একের পর এক শ্রমিকের প্রাণহানির এই ঘটনায় শিল্প খাতের প্রভাবশালী সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র প্রশ্ন জেগেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, সংগঠনের সভাপতি মহসিন চৌধুরীসহ শীর্ষ নেতাদের কাউকেই নিহতদের পরিবারের পাশে, হাসপাতালে আহতদের দেখতে কিংবা দুর্ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি। সুরক্ষাবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশের দায়ভার এবং শ্রমিক-জনতার ক্ষোভের আশঙ্কায় তারা দূরে অবস্থান করছেন বলেও মনে করেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্যমতে, শ্রমিকদের জীবন এবং হাড়ভাঙা খাটুনির ওপর নির্ভর করে শিপব্রেকিং খাতে বিপুল মুনাফা করা হলেও, চরম বিপদের সময়ে মালিকপক্ষের এই অনুপস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অমানবিক।
অন্যদিকে, মালিকপক্ষের এমন উদাসীনতার বিপরীতে অধ্যাপক আসলাম চৌধুরীর ধারাবাহিক উপস্থিতি, জানাজায় অংশগ্রহণ, শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে ছুটে যাওয়া এবং গভীর রাতে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের মতো মানবিক পদক্ষেপগুলো স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা ও শ্রদ্ধার জন্ম দিয়েছে।











