আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এক লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ দিলেন রুহুল আমিন। তিনি যশোরের সরকারি এমএম কলেজের শিক্ষার্থী এবং তৎকালীন ছাত্রশিবির নেতা। ২০১৬ সালে পুলিশি অপহরণ, অকথ্য নির্যাতন এবং পরিকল্পিতভাবে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়ার সেই দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ করে আদালতের সামনে সাক্ষ্য দেন তিনি। এই মামলায় তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমানসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে রুহুল আমিনের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় শক্তির চরম অপব্যবহার এবং নির্মমতার এক বীভতস চিত্র।
জবানবন্দিতে রুহুল আমিন জানান, বর্তমানে তার বয়স আনুমানিক ২৯ বছর এবং তিনি যশোরের ইবনে সিনা হাসপাতালে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত। ২০১৬ সালে তিনি সরকারি এমএম কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন এবং একই সাথে চৌগাছা উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার সাথে ছিলেন বন্ধু ইসরাফিল হোসেন, যিনি ওই কলেজের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র এবং চৌগাছা উপজেলা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ছিলেন।
২০১৬ সালের ৩ আগস্ট দুপুরে তারা মোটরসাইকেলে করে গ্রামের বাড়ি নারায়ণপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে ওত পেতে থাকা চৌগাছা থানা পুলিশ তাদের পথ রোধ করে এবং জোরপূর্বক থানায় ধরে নিয়ে যায়। রুহুল আমিনের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই রাতে থানার ওসির রুমে তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। প্রচণ্ড মারধরের মুখে তারা একবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফেরার পর তারা দেখেন, ওসি ভিডিও কলের মাধ্যমে তাদের তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমানের সাথে কথা করাচ্ছেন। এসপি আনিসুর রহমান নির্দেশ দেন, তাদের পরদিন তার কাছে পাঠাতে এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে।
থানায় থাকা অবস্থায় পুলিশ সদস্যরা তাদের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী অন্যান্য ব্যক্তিদের নাম ও পরিচয় জানতে চায়। জবানবন্দিতে তিনি উল্লেখ করেন, এসআই আকিকুল ইসলাম এবং ওসি মশিউর রহমান আলোচনা করেন যে, তাদের 'ব্রেইন ওয়াশ' করা হয়েছে এবং তারা কোনো নাম বলছে না, তাই তাদের গুলি করে দেওয়া উচিত।
পরদিন তাদের যশোর ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন ডিবি কর্মকর্তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, তাদের গুলি করার আদেশ এসেছে। সেই রাতে পুলিশ তাদের গাড়িতে করে পুনরায় চৌগাছা থানার দিকে নিয়ে যায়। পথিমধ্যে গাড়ি থামিয়ে তাদের চোখ বেঁধে দেওয়া হয় এবং হাতকড়া পরিয়ে পিছমোড়া করে রাখা হয়। এরপর তাদের বুন্দলীতলা মাঠের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
মাঠে নামানোর পর হঠাৎ গুলির শব্দ শোনা যায়। পুলিশ সদস্যরা চিৎকার করে একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে, যাতে মনে হয় সেখানে কোনো সংঘর্ষ বা বন্দুকযুদ্ধ চলছে। জবানবন্দিতে রুহুল আমিন বলেন, ওসি মশিউর রহমান চিৎকার করে বলেন, "সাজ্জাদ, জহুরুল ফায়ার!" ঠিক সেই মুহূর্তে তার ডান পায়ের হাঁটুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। এই কথাগুলো বলতে বলতে সাক্ষী রুহুল আমিন কান্নায় ভেঙে পড়েন। এরপরই আরেকটি গুলির শব্দ শোনা যায় এবং তার বন্ধু ইসরাফিলের আর্তনাদ ভেসে আসে।
নির্মজতা এখানেই শেষ হয়নি। পুলিশ তাদের চোখের বাঁধন খুলে ক্ষতস্থানে বালি ভরে দেয় এবং সেই গামছা দিয়েই ক্ষতস্থানটি বেঁধে দেয়। গাড়ির আলোতে তারা দেখতে পান ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদ ও জহিরুলসহ আরও অনেক পুলিশ সদস্য সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এরপর তাদের চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর পুলিশি প্রহরায় অ্যাম্বুলেন্সে করে যশোর সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দুই দিন বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখার পর তাদের ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে রেফার করা হয়। পঙ্গু হাসপাতালে সপ্তাহখানেক চিকিৎসার পর হাঁটুতে পচন ধরার কারণে রুহুল আমিন এবং তার বন্ধু ইসরাফিলের পা কেটে ফেলতে হয়।
শারীরিক পঙ্গুত্বের পাশাপাশি পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করে। দীর্ঘ ৪২ দিন কারাগারে থাকার পর তারা জামিনে মুক্তি পান। জবানবন্দির শেষে রুহুল আমিন এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদ ও জহিরুলের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।











