দীর্ঘ ২৩ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০০৩ সালে তাসমান সাগরের পাড়ের এই ক্রিকেট পরাশক্তি দেশটিতে একবারই টেস্ট সিরিজ খেলেছিল টাইগাররা। সেই দুঃস্মৃতি আর দীর্ঘ বিরতির পর এবার নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে দ্বিতীয়বারের মতো অজিদের মুখোমুখি হতে আগামীকাল উড়াল দিচ্ছে বাংলাদেশ দল। বর্তমান দলের ক্রিকেটারদের বড় একটি অংশ গত ৫ থেকে ৭ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত খেললেও, প্যাট কামিন্সদের শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদের নিজেদের মাটিতে টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম হবে অনেকের জন্য। এই চ্যালেঞ্জিং সফরটি নিয়ে ভীষণ উচ্ছ্বসিত এবং উত্তেজিত টাইগার অধিনায়ক।

গত দুই দশকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা থাকলেও টেস্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘকাল দূরে ছিল। এবার আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে সফরের শুরুতেই বড় ধাক্কা খেয়েছে দল। দলের প্রধান বোলিং অস্ত্র নাহিদ রানা এবং ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে নতুন দায়িত্ব পাওয়া লিটন দাস ইনজুরির কারণে ডারউইন টেস্টে খেলতে পারবেন না। বিশেষ করে সাইড স্ট্রেইনের কারণে আগামী ৬ থেকে ৮ মাস মাঠের বাইরে থাকতে হবে নাহিদ রানাকে, যার জায়গায় দলে নেওয়া হয়েছে মুশফিক হাসানকে। তবে এই প্রতিকূলতার মাঝেও জয়ের স্বপ্ন দেখছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। তিনি বলেন, ‘ইনজুরির ওপর আমাদের কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। যেকোনো সময় যেকোনো খেলোয়াড় ইনজুরড হতে পারে। তবে যে দলটা আমাদের অস্ট্রেলিয়াতে যাচ্ছে, আমার বিশ্বাস আছে যে আমরা সেখানে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারব। এখন কোন খেলোয়াড় থাকলে ভালো হতো, তা নিয়ে চিন্তা করা যৌক্তিক হবে না। বরং এই দলটি নিয়ে আমরা কত ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি এবং দলের ওপর কতটা বিশ্বাস রাখতে পারি, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

আগামী ১৩ আগস্ট ডারউইনে অনুষ্ঠিত হবে সিরিজের প্রথম টেস্ট। মজার ব্যাপার হলো, ২৩ বছর আগে ডারউইনে যে বাংলাদেশ দল খেলেছিল, সেই দলের সদস্য ছিলেন বর্তমান ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল এবং প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। দীর্ঘ দুই দশকের ব্যবধানে অনেক কিছু বদলে গেলেও, তাদের সেই অভিজ্ঞতা বর্তমান দলের জন্য দিকনির্দেশক হতে পারে। এছাড়া প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলার প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা নাজমুলদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে প্রস্তুতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট হেরে দেশে ফেরার পর থেকেই বৃষ্টির কারণে অনুশীলন ব্যাহত হয়েছে টাইগারদের। প্রস্তুতির ঘাটতি স্বীকার করে অধিনায়ক জানান, ‘সত্যি বলতে অস্ট্রেলিয়ার ভেন্যু দুটি সম্পর্কে খুব পরিষ্কার ধারণা নেই, তবে আমরা জানার চেষ্টা করছি। অ্যানালিস্ট এবং নির্বাচকদের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছি যে, সেখানকার কন্ডিশন অনেকটা আমাদের মতোই। কিন্তু বৃষ্টির কারণে দেশে প্রস্তুতি ঠিকমতো হয়নি। যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করেছি; গ্রানাইটের ওপর বোলিং মেশিনের সাহায্যে প্র্যাকটিস করা হয়েছে। প্রস্তুতির জায়গায় কিছুটা ঘাটতি থেকে গেছে।’

সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট অনুষ্ঠিত হবে ম্যাকেইতে, যা হবে ওই ভেন্যুর প্রথম টেস্ট ম্যাচ। ম্যাকেই শহরটি মূলত তার বিখ্যাত কোরাল দ্বীপ ‘গ্রেট ব্যারিয়ার রীফ’-এর জন্য পরিচিত। নাহিদ রানার অনুপস্থিতিতে তাসকিন আহমেদ, এবাদত হোসেন, হাসান মাহমুদ এবং খালেদ আহমেদ—এই চার পেসারের কাঁধে চেপেছে ২০ উইকেট নেওয়ার গুরুদায়িত্ব। অধিনায়ক শান্তর বিশ্বাস, পেসারদের পাশাপাশি দলের অভিজ্ঞ স্পিনাররাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। তিনি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে আমি প্রত্যাশা করি আমাদের পেসাররা ২০ উইকেট নিয়ে দেবে। এছাড়া দুজন অভিজ্ঞ স্পিনারও আছেন যারা তাদের সাহায্য করবেন। আমি মনে করি আমাদের বোলারদের সেই সক্ষমতা আছে।’

২০০৩ সালের সেই সফরের স্মৃতি বেশ করুণ। ডারউইন এবং কেয়ার্নসের টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। তৎকালীন অজি দলে ছিলেন গ্লেন ম্যাকগ্রা, জ্যাসন গিলেস্পি এবং লেগ স্পিনার স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল, যিনি দুই টেস্টে ১৭টি উইকেট নিয়েছিলেন। এবারও স্বাগতিকদের陣ে রয়েছেন নাথান লিওন, প্যাট কামিন্স এবং জশ হ্যাজলওডের মতো বিশ্বসেরা বোলাররা। উইকেট কেমন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শান্ত বলেন, ‘এত দূর থেকে কন্ডিশন বা উইকেট সম্পর্কে বলা কঠিন। ওখানে যাওয়ার পর আমরা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করব। উইকেট যেমনই হোক, আমরা সেরা ক্রিকেট খেলার চেষ্টা করব।’

২০০৩ সালে ডারউইনে ইনিংস ও ৯৮ রানে এবং কেয়ার্নসে ইনিংস ও ১৩২ রানে হেরেছিল বাংলাদেশ। দীর্ঘ ২৩ বছর পর আবারও সেই মাটিতে পা রাখা এবং টেস্ট খেলাকে ভাগ্যের ব্যাপার মনে করছেন নাজমুল হোসেন শান্ত। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করছি যে অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে তাদের সাথে টেস্ট খেলতে পারছি। গত ২৩ বছরে আমাদের আরও বেশি ম্যাচ খেলা উচিত ছিল। আমরা যদি আরও ভালো ক্রিকেট খেলতে পারতাম, তবে হয়তো আরও বেশি সুযোগ আসত। আমাদের মূল লক্ষ্য হবে সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ক্রিকেট খেলা এবং সম্মান অর্জন করা। আমরা যদি লড়াই করতে পারি, তবে ভবিষ্যতে তারা আবারও আমাদের আমন্ত্রণ জানাবে।’

এক সময় বাংলাদেশ ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে তিন ভিন্ন অধিনায়ক থাকলেও, বর্তমানে দায়িত্ব ভাগ করা হয়েছে। সাদা পোশাকের টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাজমুল হোসেন শান্ত, আর রঙিন পোশাকে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন লিটন দাস। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই সফরে শান্তর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দল অজিদের মাটিতে কতটা লড়াই করতে পারে।