জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত স্বামীর হত্যার তদন্তে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় আসার কারণে চরম প্রতিশোধের শিকার হয়েছেন এক শহীদের পরিবার। স্বামীর হত্যার বিচার চেয়ে সাক্ষ্য দিতে আসা অবস্থায় পটুয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে এইচএসসি পরীক্ষার্থী মেয়েকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অত্যন্ত আবেগঘন ও হৃদয়বিদারক সাক্ষ্য দিয়েছেন এক শহীদের স্ত্রী। ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর সামাজিক লাঞ্ছনা ও তীব্র মানসিক ট্রমা সহ্য করতে না পেরে ওই শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বলেও তিনি জানান।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে ঢাকার মোহাম্মদপুরে নয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন এই নারী। এ মামলায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ মোট ২৬ জন আসামি রয়েছেন।

আদালতে সাক্ষ্য প্রদানকালে ওই নারী জানান, স্বামীর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য ও বক্তব্য প্রদান করতে তিনি ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ ভাই ও দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। সেই সময় তার বড় মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় তাদের গ্রামের বাড়িতেই অবস্থান করছিল। ঘটনার ভয়াবহ বর্ণনা দিয়ে ট্রাইব্যুনালে তিনি বলেন, ১৮ মার্চ তার বড় মেয়ে বাবার কবর জিয়ারত শেষে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়।

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে অভিযোগ করেন যে, তিনি ঢাকায় এসে নিহত স্বামীর পক্ষে ন্যায়বিচার চেয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণেই ক্ষুব্ধ হয়ে তার নিরপরাধ মেয়ের ওপর এমন নৃশংস ও পাশবিকতা চালানো হয়েছে। ঘটনার পর এলাকায় বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তার মেয়ে চরম মানসিক আঘাত ও সামাজিক গ্লানিতে ভেঙে পড়ে। একপর্যায়ে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ও লোকলজ্জার ভয়ে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়।

স্বামীর মৃত্যুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সাক্ষী জানান, একটি বেসরকারি সংস্থায় (এনজিও) চালক হিসেবে কর্মরত তার স্বামী ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি সংঘর্ষে সামান্য আহত হন। সেই আহত অবস্থাতেই পরদিন ১৯ জুলাই তিনি পুনরায় মোহাম্মদপুরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দেন। ওই দিন সন্ধ্যায় খবর আসে যে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং তাকে দ্রুত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালে গিয়ে অপারেশন থিয়েটারের বাইরে ট্রলিতে রক্তাক্ত অবস্থায় স্বামীকে দেখতে পাওয়ার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, সেই সময় তার স্বামী জানিয়েছিলেন যে বুলেটের আঘাতে তার হাতের দুটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং বুকে গুলি লেগেছে। তাৎক্ষণিক অস্ত্রোপচারের পর তাকে বনানীর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলেও দীর্ঘ দশ দিন জীবনের সঙ্গে লড়াই করে ২৯ জুলাই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

স্বামীর মরদেহ উদ্ধার করতে গিয়েও চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে বলে জানান তিনি। বনানী ও মোহাম্মদপুর থানায় দফায় দফায় ঘোরার পর অবশেষে ৩১ জুলাই স্বামীর মরদেহ বুঝে পান এবং পরদিন সকালে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। ট্রাইব্যুনালের বিচারকের সামনে তিনি তার স্বামী হত্যা এবং মেয়ের ওপর এই পাশবিক নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত সকল অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।