কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার একতারপুর বাজারে এক ভয়াবহ রাত। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে সশস্ত্র একদল দুর্বৃত্তের তাণ্ডবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। অভিযোগ উঠেছে, নৈশপ্রহরী ও ব্যবসায়ীদের বেঁধে রেখে তিনটি স্বর্ণের দোকানসহ মোট পাঁচটি দোকানে বড় ধরনের লুটপাট চালানো হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ডাকাতি, যদিও পুলিশ একে 'চুরি' হিসেবে অভিহিত করছে।

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, রাত ১টার দিকে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে একতারপুর বাজারে প্রবেশ করে। তারা অত্যন্ত কৌশলে প্রথমে বাজারের চারজন নৈশপ্রহরীকে আটক করে এবং তাদের ওবায়দুলের চায়ের দোকানে নিয়ে যায়। সেখানে গামছা দিয়ে তাদের হাত-পা বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়। এসময় ডাকাত দলের কিছু সদস্য পাহারার দায়িত্ব নেয়, আর বাকিরা বাজারের বিভিন্ন দোকানের তালা ভেঙে লুটপাটে মত্ত হয়।

লুটপাটের প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বর্ণের দোকানগুলো। ব্যবসায়ী প্রানোতোষ বিশ্বাসের মালিকানাধীন 'পূর্ণ জুয়েলার্স'-এর দুটি শোরুম ও কারখানার তালা ভেঙে লকারের ড্রয়ার থেকে বেশ কিছু পুরোনো স্বর্ণের গহনা, প্রায় ২০ ভরি রুপা এবং নগদ ২৫ হাজার টাকা নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। একই সাথে মানিক বিশ্বাসের 'মানিক জুয়েলার্স', সঞ্জয় বিশ্বাসের 'ঈশানী বিউটি কসমেটিকস', ভ্যান প্রস্তুতকারক আব্দুল হান্নান শেখ এবং চা-দোকানি ওবায়দুলের দোকানেও লুটপাট চালানো হয়। এসব দোকান থেকে নগদ অর্থ ও মোবাইল ফোনসহ প্রয়োজনীয় মালামাল লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

নৈশপ্রহরীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ডাকাতদের প্রত্যেকের মুখ গামছা দিয়ে ঢাকা ছিল। তাদের অনেকের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র এবং সবার কাছেই ধারালো অস্ত্র ছিল। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলে এই তাণ্ডব। অভিযোগ আরও গুরুতর যে, দুর্বৃত্তরা চলে যাওয়ার সময় দুই নৈশপ্রহরীকে হাত বাঁধা অবস্থায় বাজার থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে শৈলডাঙ্গী মহাশ্মশান পর্যন্ত নিয়ে যায়, যা স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী প্রানোতোষ বিশ্বাস জানান, রাতে দোকান বন্ধ করার সময় তিনি সতর্কতার সাথে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। তা সত্ত্বেও দুর্বৃত্তরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে দোকানের সব সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে, যাতে তাদের শনাক্ত করা না যায়। তিনি বলেন, "ভোর সাড়ে ৪টার দিকে এক স্থানীয় ব্যক্তির ফোন পেয়ে আমি ডাকাতির কথা জানতে পারি। বাজারে এসে দেখি দোকানের সাটার বন্ধ, ভেতরে ঢুকে তবেই বুঝতে পারি সব লুট হয়ে গেছে।"

অন্যদিকে, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ওই বাজারে ব্যবসা করা ভ্যান মেকার আব্দুল হান্নান শেখ বলেন, তার দীর্ঘ কর্মজীবনে এমন ভয়াবহ ঘটনা তিনি কখনো দেখেননি। দুর্বৃত্তরা তাকে ধরে নৈশপ্রহরীদের সাথে বেঁধে রেখেছিল এবং তার কাছ থেকে ধার করা ৫ হাজার টাকা ও একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়।

বাজারের পাহারা ব্যবস্থাপনা কমিটির অর্থ সম্পাদক ও গ্রাম্য চিকিৎসক ওহিদুল ইসলাম জানান, বাজারে মোট পাঁচজন পাহারাদার নিয়োজিত ছিলেন, যাদের মধ্যে চারজনকে জিম্মি করে এই লুটপাট চালানো হয়। তিনি আরও জানান, ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে আসলেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়নি।

তবে এই পুরো ঘটনায় পুলিশের অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। খোকসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোল্লা জাকির হোসেন দাবি করেছেন, একতারপুর বাজারে তিনটি দোকানে চুরির ঘটনা ঘটেছে এবং এটি শতভাগ চুরির ঘটনা। যখন তাকে নৈশপ্রহরীদের বেঁধে রাখা এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি এবং ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।