রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) তহবিলের অর্থ ব্যয়ের হিসাব নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দীন আম্মার তহবিল থেকে মোট ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা উত্তোলন করলেও তার মধ্যে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার কোনো বিল-ভাউচার জমা দেননি। বিপরীতে কেবল ৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকার ভাউচার জমা পড়েছে তার নামে। রাকসুর কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের ব্যয়ের বিবরণসংক্রান্ত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
নথি অনুযায়ী, বর্তমান রাকসু পরিষদ মোট ৪২টি বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য রাকসু তহবিল থেকে ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা বরাদ্দ নিয়েছিল। তবে এই বিশাল অংকের বরাদ্দের মধ্যে ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার বিল-ভাউচার এখনো জমা পড়েনি। যদিও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এর মধ্যে কিছু কর্মসূচি এখনো চলমান রয়েছে, তাই সব হিসাব জমা হতে সময় লাগছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জিএস সালাউদ্দীন আম্মার সাতটি পৃথক ধাপে মোট ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। এর মধ্যে তিনটি ধাপে নেওয়া ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার কোনো হিসাব জমা দেওয়া হয়নি। নিখোঁজ এই অর্থের বিস্তারিত 살펴보 দেখা যায়, গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় বুথ স্থাপনের জন্য ৩ লাখ ২ হাজার টাকা, ২৭ জানুয়ারি রাকসু সদস্যদের জানুয়ারি মাসের বাজেট বাবদ ১৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা এবং ১৩ এপ্রিল দাপ্তরিক খরচ বাবদ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছিল, যার কোনো ভাউচার জমা নেই।
এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রাকসু জিএস সালাউদ্দীন আম্মার দাবি করেন, তার মেয়াদের এখনো প্রায় দুই মাস বাকি রয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অডিট সম্পন্ন করে সমস্ত হিসাব ও বিল-ভাউচার জমা দেবেন। ভর্তি পরীক্ষার বুথ স্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি জানান, সেটি ছিল প্রাথমিক বাজেট এবং তখন ব্যয়ের ওপর ভ্যাট সংযোজনের বিষয়টি জানা ছিল না, যার ফলে ৩ লাখ টাকার হিসাব সমন্বয় করে বিল করতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদকের কাছ থেকে হিসাব না আসায় একটি নির্দিষ্ট অংশের বিল জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি, যদিও অন্য একটির হিসাব জমা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
নথিতে আরও দেখা গেছে, জিএস-এর পর সবচেয়ে বেশি অর্থ উত্তোলন করেছেন রাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক মোছা. নার্গিস খাতুন। তিনি সাতটি ধাপে মোট ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৬২৬ টাকা নিয়েছেন, যার মধ্যে চার ধাপে নেওয়া ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ১২৬ টাকার কোনো ভাউচার জমা নেই। একইভাবে, রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের নামে ছয়টি ধাপে ১৩ লাখ ৪০ হাজার ৩২৪ টাকা উত্তোলন করা হলেও তিনি মাত্র ৯৯ হাজার ৯২৪ টাকার একটি কর্মসূচির ভাউচার জমা দিয়েছেন। ফলে তার বাকি ১২ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ টাকার হিসাব এখনো অজানাই রয়ে গেছে।
এই পুরো পরিস্থিতি নিয়ে রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান জানান, রাকসুর গঠনতন্ত্রে কোনো কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর হিসাব জমা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ নেই। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, সব প্রতিষ্ঠানের মতো রাকসুতেও হিসাব সংরক্ষণের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। কিছু ভাউচার নির্ধারিত ফরম্যাটে প্রস্তুত না হওয়ায় সেগুলো সংশোধন করে জমা দিতে বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যেসব ভাউচার জমা পড়েছে, সেগুলোতে বড় কোনো অসংগতি পাওয়া যায়নি। দুই টাকা খরচ করে এক টাকা দেখানোর মতো কোনো দৃশ্যমান গরমিল এখন পর্যন্ত তাদের নজরে আসেনি, কারণ প্রতিটি কার্যক্রম তারা নিবিড়ভাবে তদারকি করছেন।
এদিকে, রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম এই বিষয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, যেকোনো কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরপরই বিল-ভাউচারসহ আর্থিক হিসাব জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। রাকসুর প্রতিটি অধিবেশনে তিনি স্বচ্ছতা বজায় রাখার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। যদিও রাকসুর প্রতিনিধিরা কিছুটা সময় চেয়েছেন, তবে উপাচার্য স্পষ্ট করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ বিল-ভাউচার জমা দিতে হবে এবং রাকসুকেও এই নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।











