লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছিলেন মিশন আচার্য। উপজেলা পর্যায়ে মেধাতালিকায় তার অবস্থান ছিল ১৭তম। কিন্তু নিয়োগপত্র পাওয়ার আগমুহূর্তে স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। কারণ তার পরিবারের নিজস্ব কোনো বসতভিটা নেই। দীর্ঘদিন ধরে তারা ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।

পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর মিশনের ক্ষেত্রে সেই জটিলতার অবসান হয়। তার নামে থাকা জমির দলিলসহ অন্যান্য নথি সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হলে নিয়োগের পথ খুলে যায়। তবে এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। সরকারি চাকরি পেতে হলে কি একজন নাগরিকের নিজের নামে বসতভিটা থাকা বাধ্যতামূলক।

মিশন আচার্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চার দশকের বেশি সময় ধরে তার পরিবার ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় বসবাস করছে। তার জাতীয় পরিচয়পত্রেও ওই এলাকার ঠিকানা উল্লেখ রয়েছে। চাকরির আবেদনেও তিনি একই ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু নিয়োগের আগে ঠিকানা যাচাইয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় তার নিয়োগ প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে আটকে যায়।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, গোয়েন্দা সংস্থার যাচাইয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে স্থায়ী ঠিকানার মিল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে তার নামে থাকা জমির দলিলসহ অন্যান্য নথি সংগ্রহ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। এরপরই নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে। একজন নাগরিক একটি এলাকায় জন্মেছেন, সেখানেই বেড়ে উঠেছেন, জাতীয় পরিচয়পত্রে ওই এলাকার ঠিকানা রয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে বসবাসের প্রমাণও আছে। কিন্তু নিজের নামে কোনো জমি নেই। শুধু এই কারণে কি তাকে ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ উপজেলা বা শিক্ষা থানাভিত্তিক হয়ে থাকে। ফলে প্রার্থী কোন এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা, সেটি নিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন ও নাগরিকত্ব সনদসহ বিভিন্ন নথির মাধ্যমে পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করা হয়।

কিন্তু স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া আর সম্পত্তির মালিকানা এক বিষয় নয়। একজন মানুষ ভাড়া বাসায় থেকেও কোনো এলাকার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা হতে পারেন। নিজের নামে জমি না থাকলেও তার নাগরিক পরিচয়, ভোটার নিবন্ধন, শিক্ষাজীবন ও সামাজিক সম্পর্ক একটি নির্দিষ্ট এলাকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকতে পারে। বাংলাদেশে এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো পরিবার, দিনমজুর, নিম্ন আয়ের মানুষ কিংবা শহরের ভাড়া বাসায় বসবাসকারী অসংখ্য নাগরিকের নিজের নামে জমি নেই। তাদের নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের পরিচয় কি শুধু সম্পত্তির মালিকানার ওপর নির্ভর করবে, এই প্রশ্ন তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

নিঃসন্দেহে সরকারি চাকরিতে তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। কোনো প্রার্থী ভুল বা ভুয়া তথ্য দিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। একইভাবে স্থানীয় বাসিন্দার শর্ত থাকলে প্রশাসনের দায়িত্ব হলো তা যথাযথভাবে যাচাই করা। কিন্তু ঠিকানা যাচাইয়ের বিষয়টি যদি সরাসরি জমির মালিকানার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। স্থায়ী ঠিকানা প্রমাণে কোন কোন নথি গ্রহণযোগ্য হবে এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব বসবাসের ঠিকানার অমিল হলে তা কীভাবে সমাধান করা হবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা থাকা জরুরি।

মিশনের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, ঠিকানা নিয়ে একটি প্রশাসনিক জটিলতা কীভাবে একজন যোগ্য প্রার্থীর নিয়োগকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিতে পারে। পরে তার নিয়োগের জটিলতা কাটলেও প্রশ্নটি থেকে যায়। সরকারি চাকরি মূলত যোগ্যতা, মেধা ও নির্ধারিত আইনগত শর্ত পূরণের ভিত্তিতে পাওয়ার কথা। কারও নিজের নামে কতটুকু জমি আছে, সেটি যদি কোনো পদের যোগ্যতার শর্ত না হয়, তাহলে ঠিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও সম্পত্তির মালিকানাকে যেন অঘোষিত শর্তে পরিণত করা না হয়। ভূমিহীন বা ভাড়াটে নাগরিকদের জন্য স্থায়ী বাসিন্দা প্রমাণের গ্রহণযোগ্য নথি কী হবে, সে বিষয়ে স্পষ্টতা থাকলে ভবিষ্যতে এমন জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে।