স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন না করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে দলটি। সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুসংহত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপি।

ইতিমধ্যেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ দেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করেছে দলটি। এই তালিকায় সবচেয়ে আলোচনায় রয়েছেন দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, যাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র পদের লড়াইয়ে নামবেন দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। যদিও দলীয়ভাবে এই প্রার্থিতা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে, তবে অভ্যন্তরীণভাবে এই সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, এর আগে গত ৩০ মার্চ ঢাকাসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশনের মেয়র পদের জন্য প্রার্থী ঘোষণা করেছিল এনসিপি। তৎকালীন ঘোষণায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবকে প্রার্থী করা হয়েছিল। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও কৌশলগত কারণে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন পরিবর্তিত তালিকায় ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদ এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।

নির্বাচনের আইনি বাধ্যবাধকতা ও প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দুই নেতাই তাদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন। আসিফ মাহমুদ ঢাকা দক্ষিণের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আফতাবনগর এলাকার ভোটার হয়েছেন। একইভাবে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা উত্তরের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে ঢাকা দক্ষিণের আওতাধীন ঢাকা-৮ সংসদীয় এলাকার ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন।

গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, "ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদ মেয়র পদে নির্বাচন করবেন এবং দক্ষিণে আমার নির্বাচন করার কথা রয়েছে। তবে দল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করার পরই বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা হবে।" অন্যদিকে, আসিফ মাহমুদ জানান, ভোটার এলাকা পরিবর্তন করাটা মূলত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণের একটি প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে দলের সর্বোচ্চ ফোরামে বিস্তারিত আলোচনার পর তাঁকে ঢাকা উত্তরে এবং নাসীরুদ্দীনকে ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত ঘোষণাটি দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হবে।

এনসিপির ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে আরও তিনটি সিটি করপোরেশনে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, রাজশাহী সিটি করপোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক আবদুর রহমান আফজাল মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেই নির্বাচনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের সাথে তাঁর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয় এবং অল্প ব্যবধানে তিনি পরাজিত হন। অন্যদিকে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আসিফ মাহমুদ ওই সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি।

এনসিপি এবং জামায়াতের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে প্রার্থী দেওয়ার কোনো পূর্ব ইতিহাস বা নজির নেই। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে সূত্রগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে প্রার্থী দিলেও রাজনৈতিকভাবে ১১ দলীয় ঐক্য সম্পূর্ণ অটুট থাকবে। বিশেষ করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিরসন এবং বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জোটভুক্ত দলগুলো আগামীতেও ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি পালন করবে।