২৬ বছর ধরে প্রতিদিন যার হাতের স্পর্শে বেজেছে ক্লাসের ঘণ্টা, যার সেই পরিচিত শব্দে শুরু হয়েছে হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নজয়ের পথচলা—সেই প্রিয় মুখটি আজ বিদায় নিলেন। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার গোবিন্দপুরে অবস্থিত সোনার বাংলা কলেজের অফিস সহায়ক মো. নাছির উদ্দিন গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে শেষবারের মতো ঘণ্টা বাজিয়ে দীর্ঘ কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। এটি কেবল একজন কর্মচারীর অবসর নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের এক যুগের সমাপ্তি এবং এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ।

২০০০ সালের ৭ জুন, যেদিন এই কলেজের শুভ যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেদিন থেকেই নাছির উদ্দিনের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের এক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন থেকে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি আজ অবসরে গেলেন। বৃহস্পতিবার ছিল তার শেষ কর্মদিবস, যা কলেজ প্রাঙ্গণে এক বিষণ্ণ অথচ শ্রদ্ধাশীল পরিবেশ তৈরি করেছিল। দীর্ঘ ২৬ বছরের স্মৃতি যখন তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল, তখন শেষবারের মতো ঘণ্টা বাজিয়ে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি নাছির উদ্দিন নিজেই। তার এই বিদায় মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন এবং হৃদয়স্পর্শী।

দীর্ঘ ২৬ বছরের সহযাত্রী এবং কম্পিউটার বিভাগের শিক্ষক মিজানুর রহমান তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। উপস্থিত সহকর্মীদের চোখে ছিল জল, আর মনে ছিল এক গভীর শূন্যতা। সহকর্মীদের মতে, নাছির উদ্দিন কেবল একজন সাধারণ অফিস সহায়ক বা কর্মচারী ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন সোনার বাংলা কলেজ পরিবারের এক নিবেদিতপ্রাণ সদস্য এবং অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব। অতিথিদের উষ্ণ আপ্যায়ন থেকে শুরু করে দাপ্তরিক জটিল কাজ কিংবা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ছোটখাটো প্রয়োজন—সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক, তৎপর এবং অমায়িক।

কলেজের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং বর্তমানে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকার সাইফুল ইসলাম ও শিক্ষক মাকসুদা আক্তার স্মৃতিচারণ করে বলেন, "নাছির ভাই ছিলেন অসম্ভব সহজ-সরল এবং পরোপকারী একজন মানুষ। তিনি এই কলেজটিকে কেবল একটি কর্মস্থল মনে করেননি, বরং নিজের পরিবারের মতো ভালোবাসতেন। আর এখানকার শিক্ষার্থীদের দেখতেন নিজের সন্তানের মতো। দীর্ঘ ২৬ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় তার সেই অমায়িক স্বভাব এবং বিনয়ের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। তিনি আমাদের সবার কাছে এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।"

প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আবু ছালেক মো. সেলিম রেজা সৌরভের কণ্ঠে ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। তিনি বলেন, "প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকে নাছির উদ্দিন আমাদের সঙ্গে ছিলেন। দীর্ঘ ২৬ বছর তিনি নীরবে, অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তার প্রতিটি দায়িত্ব পালন করেছেন। সোনার বাংলা কলেজের ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় তার কঠোর শ্রম, ঘাম এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা মিশে আছে। তার অবসর আমাদের জন্য এক ধরণের প্রাপ্তি, কারণ তিনি সফলভাবে তার দায়িত্ব শেষ করেছেন, কিন্তু বিদায়ের এই মুহূর্তটি সত্যিই বেদনাদায়ক।"

তিনি আরও যোগ করেন যে, নাছির উদ্দিনকে কেবল একজন অফিস সহায়ক হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত অবদানকে খাটো করা হবে; তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠানের এক নিবেদিতপ্রাণ মানুষ, যার সততা এবং আন্তরিকতা সত্যিই অনুকরণীয়। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি নাছির উদ্দিনের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনও অত্যন্ত সফল এবং গৌরবময়। তার বড় মেয়ে একজন চিকিৎসক এবং ছোট মেয়ে বর্তমানে অনার্সে অধ্যয়নরত। পারিবারিক সাফল্যের খতিয়ান আরও দীর্ঘ—বড় মেয়ের জামাইও একজন চিকিৎসক এবং ছোট মেয়ের জামাতা ইতালি প্রবাসী।

শেষ কর্মদিবসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে কলেজের গাড়িতে করে তাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। গাড়িটি যখন ধীরে ধীরে কলেজ প্রাঙ্গণ ছেড়ে চলে যাচ্ছিল, তখন উপস্থিত সহকর্মীরা পুনরায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ২৬ বছরের কর্মজীবন শেষ করে তিনি অবসরে গেলেও, সোনার বাংলা কলেজের সঙ্গে তার আত্মার সম্পর্কটুকু রয়ে গেল। তার সততা, নিষ্ঠা এবং ভালোবাসার স্মৃতি এই কলেজের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার অভাব কলেজ প্রাঙ্গণে প্রতিটি মুহূর্তে অনুভূত হবে, তবে তার রেখে যাওয়া আদর্শ আগামী প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।