রফিকুল ইসলাম সোহাগ
একই বাবার চার সন্তানের তিনজন যখন পৈতৃক বসতভিটায় স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটাচ্ছেন, তখন অন্য এক ভাই ভিটেমাটি হারিয়ে ঘুরেছেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। প্রবাসে বছরের পর বছর রক্তপানি করা উপার্জনের পর দেশে ফিরে ব্রেইন স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হলেও নিজ জন্মভিটায় মাথাগুছাড় জায়গা মেলেনি তার। শেষ পর্যন্ত অন্যের বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নিয়ে অনাদরে-অবহেলায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছে প্রবাসফেরত বৃদ্ধ শামস উদ্দিনকে।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাক ইউনিয়নের চানপুর গ্রামে। মৃত শামস উদ্দিন ওই গ্রামের মৃত মন্তাজ আলীর ছেলে।
স্থানীয় ও স্বজন সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন শামস উদ্দিন। দেশে ফেরার পর হঠাৎ ব্রেইন স্ট্রোক করে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু অসুস্থ অবস্থায় নিজ পৈতৃক ভিটায় ফিরতে চাইলে ভাইদের তীব্র বাধা ও বিরোধের মুখে পড়েন। ভাইদের সাফ কথা-এ ভিটায় তার কোনো জায়গা নেই।
পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে বিতাড়িত হয়ে অসহায় অবস্থায় মানুষের দরজায় ঘুরতে থাকেন এই বৃদ্ধ।
মৃত শামস উদ্দিনের সন্তানদের অভিযোগ, তাদের বাবার নামে থাকা রেকর্ডীয় জমি চাচারা জোরপূর্বক দখল করে ভোগ করছেন। ভিটায় পা রাখলেই তাদের বাবাকে তাড়িয়ে দেওয়া হতো। বাবার ন্যায্য অধিকার আদায়ে বর্তমানে আদালতে একটি মামলাও চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে, শামস উদ্দিনের ভাইদের পাল্টা দাবি,
তারা নিজস্ব টাকা খরচ করে তাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। তাই তাদের মতে, বাবার সম্পত্তিতে শামস উদ্দিনের আর কোনো প্রাপ্য অবশিষ্ট নেই, বিদেশে পাঠানোর সময়ই তা শোধ হয়ে গেছে।
তবে ভাইদের এমন যুক্তিকে ভিত্তিহীন ও অমানবিক বলে আখ্যা দিয়েছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। স্হানীয়দের দাবি আইন ও সামাজিকভাবে পৈতৃক সম্পত্তিতে সন্তানের অধিকার যেখানে সুনির্দিষ্ট, সেখানে বিদেশ পাঠানোর অজুহাতে ভিটেমাটি থেকে বঞ্চিত করা এবং অসুস্থ অবস্থায় তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা পুরো এলাকায় ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি করেছে।
অবশেষে আশ্রয়হীন ও অসুস্থ বৃদ্ধ শামস উদ্দিনকে আশ্রয় দিয়ে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন চানপুর গ্রামেরই প্রবাসী আলম নামের এক ব্যক্তি।
তিনি জানান, হঠাৎ একদিন অসুস্থ শামস উদ্দিন এসে আমাদের বাড়িতে হাত জোড় করে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই চান। মানুষ মানুষের জন্য,এই তাগিদ থেকেই তাকে আমার একটি নির্মাণাধীন ঘরে থাকতে দিই।
এ দিকে,
দীর্ঘদিন অন্যের বারান্দায় ও প্রবাসীর দেওয়া ঘরে চিকিৎসাধীন থাকার পর সকালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন শামস উদ্দিন।
পৈতৃক জমিজমার জবরদখল ও এক ভাইয়ের প্রতি বাকি ভাইদের এমন নির্মম আচরণ পুরো শান্তিগঞ্জ উপজেলায় একটি প্রশ্নবিদ্ধ ও বহুল আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সচেতন মহলের মতে, আইনগত ও নৈতিক কোনো বিচারেই একজন অসুস্থ মানুষকে তার পৈতৃক ভিটে থেকে বঞ্চিত করা সমর্থনযোগ্য নয়।
এমন অসহায় পরিবারের এখন আইনি লড়াই ছাড়া আর কোন পথ নেই, সমাজের সচেতন মানুষ বলছেন, আদালতের দারস্থ হলে তারা ন্যায় বিচার পেতে পারেন তাই তাদের উচিত বিজ্ঞ আদালতে দারস্থ হওয়া।

















