প্রলয়ঙ্কারী বন্যায় মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে মানুষের সাজানো সংসার। চারদিকে এখন কেবল কাদা, পলি আর ধ্বংসাবশেষের স্তূপ। উদ্ধারকাজে নিয়োজিত ভারী যন্ত্রপাতির বিকট শব্দে চারপাশ মুখরিত, কিন্তু এই কোলাহলের মাঝেই নিজের পুরোনো ঠিকানায় নিঃশব্দে বসে আছে একটি কালো-সাদা কুকুর। তার গলায় থাকা বেল্টটি এখনো অক্ষত, যা হয়তো তার কোনো এক প্রিয় মানুষের দেওয়া শেষ স্মৃতি। নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী বাজারে গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যার পর এমন এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য নজর কেড়েছে উদ্ধারকর্মীদের। বানের প্রবল স্রোতে সারিবদ্ধ চারটি বাড়ি সম্পূর্ণ ভেসে যাওয়ার পর পুরো এলাকাটি এখন এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আর সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই নিজের পরিচিত উঠোনের শেষ চিহ্নটি আঁকড়ে ধরে বসে আছে প্রাণীটি।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবক বিক্রম থাপা জানান, প্রথম দিকে তারা কুকুরটিকে সেখান থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। বিস্কুট খাওয়ানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন নামে ডেকে তাকে প্রলুব্ধ করা হয়, কিন্তু প্রাণীটি কোনো কিছুতেই সাড়া দেয়নি। কুকুরটির গলার বেল্টটি এখনো ঠিকঠাক রয়েছে, তবে তার মালিক কে ছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি উদ্ধারকারীরা। বন্যায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া চারটি বাড়ির ঠিক কোনটিতে কুকুরটি বাস করত, সেটিও জানা যায়নি। তবে একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সে এক চুলও নড়ছে না—এটাই উদ্ধারকর্মীদের কাছে সবচেয়ে স্পষ্ট ও বিস্ময়কর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের কাজে নিয়োজিত সুনীল তামাং লক্ষ্য করেছেন, কুকুরটির মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বেই চলছে জেসিবি ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতির কাজ। চারপাশের প্রচণ্ড শব্দেও প্রাণীটি মোটেও আতঙ্কিত হচ্ছে না। মাঝে মাঝে মানুষের হাঁটার শব্দ কিংবা কোনো যানবাহনের আওয়াজ শুনে সে সতর্ক হয়ে মাথা তুলে তাকাচ্ছে। কিন্তু পরিচিত কাউকে না পেয়ে সে পুনরায় তার সেই নির্দিষ্ট জায়গাতেই শুয়ে পড়ছে। উদ্ধারকর্মীরা উপলব্ধি করছেন, কুকুরটি সম্ভবত তার পরিচিত মানুষদের জন্য গভীর অপেক্ষায় রয়েছে। তাই জোর করে তাকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন পশুকল্যাণকর্মীরা।
প্রাণী উদ্ধারকর্মী রীতা গুরুং জানিয়েছেন, এখন কুকুরটির কাছেই নিয়মিত খাবার ও পানি রেখে যাওয়া হচ্ছে। আশপাশ কিছুটা নিরিবিলি হলে সে সেখান থেকে খাবার খাচ্ছে, তবে মানুষের ভিড় বা উদ্ধারকাজের ব্যস্ততার মাঝে সে নিজের জায়গা ছেড়ে বের হচ্ছে না। বন্যার সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা মনে করে স্থানীয় বাসিন্দা মায়া অধিকারী জানান, পানি বাড়তে শুরু করলে এলাকার অধিকাংশ কুকুরই নিরাপদ উঁচু জায়গায় চলে গিয়েছিল। কিন্তু এই কুকুরটি তার পরিচিত বাড়ি ও উঠোন ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবেনি। স্থানীয় ব্যবসায়ী দিনেশ বাসয়ালের চোখেও ঘটনাটি অত্যন্ত কষ্টের। তিনি বলেন, বন্যায় মানুষ যেমন স্বজন ও ঘরবাড়ি হারিয়েছে, এই প্রাণীটিও ঠিক তেমনি হারিয়েছে তার আশ্রয় ও ভালোবাসার মানুষ। পার্থক্য শুধু এটুকু যে, কী ঘটেছে তা বোঝার মতো সক্ষমতা তার নেই। পরিচিত মানুষগুলো একদিন ফিরে আসবে—এই অটল বিশ্বাস আর আশায় হয়তো ধ্বংসস্তূপের মাঝেও সে অনন্তকাল অপেক্ষা করে যাচ্ছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া















