জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে নির্মিত একটি তথ্যচিত্রকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই বিতর্কিত তথ্যচিত্রটির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিলেন খোদ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম। জানা গেছে, তথ্যচিত্রটি চূড়ান্ত করার আগে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে একাধিকবার প্রদর্শিত হয়। সেই প্রক্রিয়ায় উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয় নির্দিষ্ট কিছু ছবি, ভিডিও এবং তথ্য বাদ দেওয়ার জন্য। এর ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রকৃত ঘটনা তথ্যচিত্র থেকে বাদ পড়ে, যা পরবর্তীতে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। শুধু তাই নয়, তথ্যচিত্রটির নির্মাণ কমিটির সদস্যদের তালিকায় মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) এবং প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিবের (এপিএস) নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

গত ৫ আগস্ট উক্ত তথ্যচিত্রটি প্রকাশের পরপরই দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়। তবে এই বিষয়ে কথা বলতে নারাজ ছিলেন সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বৃহস্পতিবার দিনভর মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে দফায় দফায় জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এই বিতর্কিত তথ্যচিত্রের বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এবং সচিব মো. আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করা হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি এই বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে তারা কথা বলতে রাজি হননি।

তবে রাতের বেলা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রদর্শিত তথ্যচিত্রটির বিষয়ে যে সকল অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তা গুরুত্বের সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরিমার্জন এবং সংশোধনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটি পুনরায় প্রকাশ করা হবে। মন্ত্রণালয় আরও উল্লেখ করেছে যে, তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে নির্ভুল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং তথ্যভিত্তিক উপায়ে সংরক্ষণে সম্পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ এবং এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিতর্ক ঘনীভূত হওয়ার পর বৃহস্পতিবার বিকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানকে ডেকে পাঠান। এর আগে দুপুর থেকেই মন্ত্রী নিজ দপ্তরে তথ্যচিত্র প্রস্তুত কমিটির সদস্যদের নিয়ে এক বিশেষ বৈঠক করেন। উক্ত বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম এবং জুলাই অভ্যুত্থানের তথ্যচিত্র প্রস্তুত কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দীন আহমেদসহ অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন, তবে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন।

মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ৮ জুলাই অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউদ্দীন আহমেদকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটির মূল লক্ষ্য ছিল জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রদর্শনের জন্য একটি তথ্যচিত্র প্রস্তুত করা। কমিটির সদস্য হিসেবে ছিলেন যুগ্মসচিব মোহাম্মদ ফারুক হোসেন, মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) মো. জেহাদ উদ্দিন, প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) শেখ মো. আরিফুল ইসলাম এবং সদস্য সচিব হিসেবে ছিলেন জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবুল খায়ের। তবেInterestingly, ২৩ জুলাই হঠাৎ করেই সদস্য সচিব আবুল খায়েরকে পাবলিক ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্টে (পিআইডি) বদলি করা হয়।

সূত্রমতে, একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এই তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছিল এবং খসড়াটি দুই দফায় মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রদর্শিত হয়। প্রথম খসড়ায় শহীদ আবু সাঈদ এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও ফুটেজ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের একজনের বিশেষ নির্দেশনায় সেই অংশগুলো বাদ দেওয়া হয় এবং পরিবর্তে বিএনপির কর্মসূচিগুলোকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মন্ত্রীর দপ্তরে যোগাযোগ করলে নতুন জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শাকিলুজ্জামান জানান, মন্ত্রী বর্তমানে ব্যস্ত থাকায় কথা বলতে পারবেন না। প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে যোগাযোগ করে জানা যায় তিনি সেখানে নেই এবং আহ্বায়ক অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউদ্দীন আহমেদও দপ্তরের বাইরে মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, বুধবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে যখন তথ্যচিত্রটি প্রচারিত হয়, তখন এনসিপি’র নেতারা তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাদের অভিযোগ ছিল, তথ্যচিত্রটিতে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং প্রকৃত ঘটনা সঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়নি। এই আপত্তির ফলে অনুষ্ঠানে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং বাগ্বিতণ্ডার এক পর্যায়ে উপস্থিত বিদেশি কূটনীতিকরাও বিব্রত হয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। এই হট্টগোলের কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষমতাসীন দল বিএনপিও এখন রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।

তবে প্রতিবাদের এই ধরনকে মন্ত্রণালয় ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, যে কোনো নাগরিকের অভিযোগ জানানোর অধিকার থাকলেও তা হতে হবে পরিশীলিত ও নিয়মতান্ত্রিক। কিন্তু রাষ্ট্রপতি, বিদেশি কূটনীতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে গোলযোগ সৃষ্টি করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, এটি কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বানচাল করার এবং রাষ্ট্রের সম্মানহানির একটি পরিকল্পিত প্রয়াস ছিল কিনা। মন্ত্রণালয় মনে করে, ভিন্নভাবে প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যার ফলে আমন্ত্রিত শহীদ পরিবার এবং আহত জুলাই যোদ্ধারা মানসিকভাবে আহত হয়েছেন।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা রাষ্ট্রের জন্য সম্মানহানিকর এবং গণতন্ত্রের জন্য বিপর্যয়কর। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সবাইকে বিভ্রান্তিকর এবং সম্মানহানিকর অপতথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, এ ধরনের অপতথ্য ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করা এবং রাষ্ট্রকে আবারও ফ্যাসিবাদের কবলে নিয়ে যাওয়ার শামিল। তাই পুরো জাতিকে এ ধরনের হটকারী, রাষ্ট্রবিরোধী এবং গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।