সমন্বিত উদ্যোগ ও সামাজিক সচেতনতা আনলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব: ইলিয়াস কাঞ্চন
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকোপ কমিয়ে আনতে সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বিশ্বাস করেন, বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর মতো সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে বাংলাদেশেও সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব। শুক্রবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত 'নিসচার ১১তম মহাসমাবেশ-২০২৬'-এ তিনি এই মতামত ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে সরকারের বর্তমান উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানিয়ে নিসচার পক্ষ থেকে বাস্তবভিত্তিক একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা এবং ১২ দফা সুপারিশপত্র হস্তান্তর করা হয়।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা কোনো একক ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক জাতীয় দায়িত্ব। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, নিরাপদ সড়ক পাওয়া কোনো বিশেষ দাবি নয়, বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক, প্রকৌশলী, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গণমাধ্যম এবং সর্বস্তরের জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, "আমরা কারও প্রতিপক্ষ নই; আমরা কেবল মানুষের জীবনের পক্ষে। যতদিন পর্যন্ত দেশের প্রতিটি মানুষ নিরাপদে তার গন্তব্যে পৌঁছে ঘরে ফিরতে পারবে না, ততদিন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।" তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাদের লক্ষ্য কোনো সমালোচনা করা নয়, বরং সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করে একটি দুর্ঘটনামুক্ত, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা রাস্তাঘাট নির্মাণের মাধ্যমে একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রকৃত উন্নয়ন আসে মানুষের মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং আইন মেনে চলার সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন। তিনি প্রস্তাব করেন যে, নাটক, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, লোকসংস্কৃতি, পথনাটক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো শক্তিশালী মাধ্যমগুলোকে কাজে লাগিয়ে সড়ক নিরাপত্তার বার্তা দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দিতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের শৈশব থেকেই ট্রাফিক আইন, শৃঙ্খলা এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সচেতন হবে এবং সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে।
নিসচা-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মহাসমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সড়ক পরিবহন ও সেতু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই)-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. শামসুল হক এবং নিসচা মহাসচিব লিটন এরশাদ। মহাসমাবেশের শেষে সংগঠনটির পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয় যে, প্রস্তাবিত সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি পরিবহন খাতে সুশাসন, স্বচ্ছ জবাবদিহিতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিবিড় গবেষণা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ একটি নিরাপদ, টেকসই ও মানবিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে।







