পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে ডিআইটি মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি তথাকথিত ‘অস্থায়ী মেলা’ এখন চরম জনভোগান্তি, অবৈধ দখল এবং চাঁদাবাজির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মেলার স্টল বসিয়ে রাস্তার বড় অংশ দখল করে রাখা এবং সেই স্টলগুলো থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কিছু ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে। অভিযোগের মুখে যারা রয়েছেন তারা হলেন—সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম রুবেল এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব নাজমুল হাসান।

স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ঈদের আগে শুরু হওয়া এই মেলাটি প্রায় আড়াই মাস ধরে চলছে। তবে মেলাটি কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা বা সময়সীমা নেই। এর ফলে ডিআইটি মার্কেট ও লক্ষ্মীবাজার এলাকার গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথগুলোর একটি বড় অংশ এখন মেলার দখলে। এতে করে পথচারী, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

গত বুধবার (১২ আগস্ট) ওই এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ডিআইটি মার্কেটের পাশে সারিবদ্ধভাবে মেলার স্টল বসানো হয়েছে। সেখানে কর্মরত এক ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ওই নির্দিষ্ট এলাকায় মোট চারটি স্টল রয়েছে এবং প্রতিটি স্টল থেকে প্রতিদিন ৩ হাজার ৩৫০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানদার ক্ষোভের সাথে জানান, “প্রতিদিন স্টল ভাড়া বাবদ আমাদের ৩ হাজার ৩৫০ টাকা দিতে হয়। মেলা শুরুর প্রথম দিন থেকেই নিয়মিত এই টাকা নেওয়া হচ্ছে। ছাত্রদলের জসিম, রুবেল এবং নাজমুল সরাসরি আমাদের মালিকদের কাছ থেকে এই অর্থ আদায় করেন। আমরা বাধ্য হয়ে তাঁদের টাকা দিয়ে থাকি।”

ব্যবসায়ীদের দাবি, এই পুরো মেলা পরিচালনার নেপথ্যে কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিন নেতার নেতৃত্বে প্রতিটি স্টল থেকে প্রতিদিন ৩ হাজার ৩৫০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন। তবে এই অর্থ আদায়ের কোনো বৈধ অনুমোদন, রসিদ বা লিখিত নথি দেখাতে পারেননি ব্যবসায়ীরা, যা এই আদায়ের অবৈধতাকে আরও স্পষ্ট করে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ কেবল চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নয়; মেলায় ব্যবহৃত দোকানগুলোতে সম্পূর্ণ অনুমোদনহীনভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও কারিগরি অনুমোদন ছাড়া এভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মেলার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। লক্ষ্মীবাজার ও জনসন রোডের সংযোগকারী এই পথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান দিয়ে মহানগর মহিলা কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত যাতায়াত করেন। সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থী জানান, “এখানে আগে একটি কোচিং সেন্টার ছিল। কিন্তু মেলা এবং মার্কেটের জায়গা দখলের কারণে কোচিং সেন্টারের কক্ষগুলো ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। পুরো মার্কেট এলাকাটি এখন কার্যত দখল করে নেওয়া হয়েছে।”

সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থী ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “যেকোনো মেলা করতে হলে তার জন্য নির্ধারিত জায়গা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত। প্রায় আড়াই মাস ধরে চলা এই মেলাটি দেখে মনে হচ্ছে, এটি জনসেবা বা উৎসবের জন্য নয়, বরং শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যেই চালানো হচ্ছে।” এছাড়া ডিআইটি মার্কেটের পাশের এক ফুটপাত ব্যবসায়ী জানান, মেলার কারণে তাঁর ব্যবসাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মেলার ভিড়ের কারণে অনেক সময় তাঁদের দোকানের সামনে যাতায়াত অসম্ভব হয়ে পড়ে, ফলে ক্রেতারা আসতে পারেন না।

এই সব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে কবি নজরুল সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব নাজমুল হাসান বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং পরিকল্পিত। আমরা এই এলাকায় রাজনীতি করি বলেই একটি বিশেষ মহল আমাদের নামে এসব মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছুই আমার জানা নেই।”

অন্যদিকে, সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম রুবেল বলেন, “আমি এই বিষয়ে অবগত নই। তবে বিষয়টি জানার পর আমরা সংশ্লিষ্টদের আলটিমেটাম দিয়েছি। দোকান না সরালে আমরা গিয়ে তা ভেঙে দেব—এ কথা স্পষ্টভাবে বলেছি। আশা করি তাঁরা দ্রুত দোকান উঠিয়ে চলে যাবেন, অন্যথায় আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।”

সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিনকে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি বর্তমানে একটি প্রোগ্রামে ব্যস্ত আছেন, তাই পরে কথা বলবেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা এবং শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে মেলার বৈধতা যাচাই, অবৈধ অর্থ আদায় বন্ধ এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়ে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন যাতে লক্ষ্মীবাজার এলাকার এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দূর হয় এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ পুনরুদ্ধার করা যায়।