রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কার্যকর হবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ: প্রধান হুইপ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন যে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত এক প্রস্তুতিমূলক সভার পর আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, "সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে যেহেতু এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সংশোধন করা হয়নি, সেহেতু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এই অনুচ্ছেদটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে।" সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, দলের নির্ধারিত সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো সংসদ সদস্য নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। যদি কোনো সংসদ সদস্য তার দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট প্রদান করেন, তবে নিয়ম অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে।
আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে ভোটার হিসেবে অংশ নেবেন সংরক্ষিত আসনের ৫০ জন নারী সদস্যসহ মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। রাজনৈতিক অঙ্গনে এবারের নির্বাচনটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ ক্ষমতাসীন বিএনপির পাশাপাশি ১১ দলীয় জোটও তাদের প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে বিগত সময়ে যেভাবে একক প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার প্রথা ছিল, এবার তেমন সুযোগ থাকছে না; বরং একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটদানের বিস্তারিত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে চিফ হুইপ বলেন, "সংসদ সদস্যরা প্রার্থীর নামের সামনে স্পষ্টভাবে তার নাম লিখবেন এবং বিভক্তি সংখ্যা উল্লেখ করবেন। এর ফলে ভোটার কে কাকে ভোট দিচ্ছেন, তা প্রকাশ্যে জানা যাবে।" তিনি আরও জানান, এই নির্বাচনের জন্য আলাদা করে কোনো বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রয়োজন নেই। নির্ধারিত ভোটের দিনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংসদ কক্ষে বিশেষ বৈঠক আহ্বান করবেন। উক্ত বৈঠকে সংসদ সদস্যরা তাদের নির্ধারিত আসনে বসবেন এবং নির্বাচনী কর্তা হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই সভাপতিত্ব করবেন।
তফসিল অনুযায়ী, ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। যদি এক ঘণ্টার মধ্যেই ভোটদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যায়, তবে দ্রুত গণনা করে ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তবে কোনো ভোটার দেরি করলেও বিকাল ৫টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে। নুরুল ইসলাম মনি আরও জানান, ভোটদানের প্রক্রিয়ায় প্রথমে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং স্পিকারের ভোট দেওয়ার দৃশ্য গণমাধ্যমে প্রদর্শিত হবে। এরপর অন্যান্য সংসদ সদস্যরা নির্ধারিত সময়ে তাদের ভোট দেবেন এবং সবার ভোটদান শেষ হলে চূড়ান্ত গণনা শুরু হবে।
মঙ্গলবার সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে এই প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়, যার সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। সভায় প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ছাড়াও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং হুইপ প্যানেলের সদস্য মো. জি কে গউছ, রকিবুল ইসলাম বকুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ, মো. আখতারুজ্জামান মিয়া ও এ. বি. এম আশরাফ উদ্দিন নিজান উপস্থিত ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল সভায় বলেন, "রাষ্ট্র কাঠামোর সর্বক্ষেত্রে ফ্যাসিস্টমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ফ্যাসিবাদমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।"
বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন প্রসঙ্গে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, "প্রধানমন্ত্রী যখন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন, তখন আমরা সবাই একসাথে তা জানতে পারব। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রার্থীর নাম সবার সামনে পরিষ্কার হবে।" তিনি আরও জানান, দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারেক রহমানকে, তিনিই চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিরোধী দল থেকেও প্রার্থী দেওয়া হয়েছে, যা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ এবং গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদকে মনোনীত করেছে। এই বিষয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, "গণতন্ত্রের স্বার্থে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রয়োজন এবং আমরা এর মাধ্যমে দেশবাসীকে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান জানাতে চাই। আমরা মনে করি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভিভাবকত্ব হিসেবে আমাদের প্রার্থী অলি আহমদ সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব হবেন।"
তবে নাহিদ ইসলাম মনে করেন, 'জুলাই সনদ' অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়া উচিত ছিল। তিনি মন্তব্য করেন, "যেহেতু গণভোটের রায় সংস্কারের পক্ষে এসেছে, তাই ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যেত। সেক্ষেত্রে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আরও বেশি সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য হতেন। তবুও যেহেতু নির্বাচন হচ্ছে, আমরা একে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দিতে চাইনি, তাই বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী দিয়েছি।"
এর বিপরীতে প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি দাবি করেন, জুলাই সনদ অনুযায়ীও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ৭০ অনুচ্ছেদে অর্থবিল এবং আস্থাভোট ছাড়া অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মত দেওয়ার সুযোগ পান।










