কর্মস্থলে দীর্ঘকাল অনুপস্থিত থাকার দায়ে বড় ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিল সরকার। সরকারি দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা এবং কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন এবং সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস। বুধবার (১২ আগস্ট) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর আওতায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ার পর তাঁদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে তাঁদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছেন। তিনি এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে তাঁর ভূমিকা এবং একটি বিতর্কিত মন্তব্য তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে আন্দোলন দমনের কথা বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, 'গুলি করি, মরে একটা... একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না'। এই মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক জনরোষ তৈরি হয় এবং তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখার প্রজ্ঞাপনে বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে, মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বর্তমানে রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়, খুলনায় সংযুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট তাঁকে পুলিশ সুপার হিসেবে খুলনার রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করার আদেশ দেওয়া হয়। এরপর ওই বছরের ২৮ আগস্ট অপরাহ্নে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি কর্মস্থল থেকে নিখোঁজ হয়ে যান।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, ২৮ আগস্ট ২০২৪ থেকে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তাঁকে ফিরিয়ে আনতে এবং তাঁর অবস্থান জানতে কর্তৃপক্ষ একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সরকারি আদেশ প্রতিপালনে অবজ্ঞা এবং দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলার এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছে মন্ত্রণালয়। ফলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ‘পলায়ন’ বা পলাতক থাকার গুরুতর অভিযোগ আনা হয় এবং তদন্ত শেষে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়।
অন্যদিকে, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধেও কর্মস্থলে দীর্ঘ অনুপস্থিতির অভিযোগ ছিল, যার ফলে বিভাগীয় তদন্ত শেষে তাঁকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং সরকারি আদেশ অমান্যকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে সরকার এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরে শুদ্ধি অভিযান এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এই বরখাস্তকরণ তারই একটি অংশ।








