বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। মেধা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বিগত দিনের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম—বিশেষ করে জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ও পরীক্ষিত ভূমিকা বিবেচনা করে নতুন ছাত্রনেতৃত্ব নির্বাচন করতে যাচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড। সংগঠনের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে এই নতুন কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে সবকিছু প্রস্তুত, এখন শুধু বিএনপি চেয়ারম্যান ও তারেক রহমানের চূড়ান্ত অনুমোদনের বা ‘গ্রিন সিগন্যালের’ অপেক্ষা।
আসন্ন এই কমিটিতে শীর্ষ পদগুলোর জন্য শেষ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন রাজপথের ত্যাগী তিন ছাত্রনেতা— মো. আমানউল্লাহ আমান, মমিনুল ইসলাম জিসান এবং শেখ তানভীর বারী হামিম। মাঠপর্যায়ের রাজনীতি এবং বিগত দিনের ত্যাগের বিচারে মো. আমানউল্লাহ আমানের নাম অত্যন্ত জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব এবং বর্তমানে কেন্দ্রীয় সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সেই উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে তার সাহসী ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে তিনি যে অদম্য সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তা তাকে শীর্ষ পদের অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সদ্য সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির ১নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মমিনুল ইসলাম জিসান। ওয়ার্ড পর্যায় থেকে ছাত্ররাজনীতি শুরু করে তিনি ধাপে ধাপে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি অসংখ্য আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন এবং একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। স্বৈরাচারবিরোধী ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তিনি পুলিশি নির্যাতন ও আটকের শিকার হয়েছিলেন। তার প্রতি এই নির্যাতনের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পৃথক বিবৃতি দিয়েছিল, যা তার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রমাণ দেয়।
কেন্দ্রীয় কমিটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম শেখ তানভীর বারী হামিম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীম উদ্দীন হল শাখা ছাত্রদলের এই আহ্বায়ক ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলেন। জুলাইয়ের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত জোরালো ও দৃশ্যমান। ফ্যাসিবাদের পতন ঘটাতে প্রথম দিন থেকেই তিনি রাজপথে সোচ্চার ছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই স্পষ্টভাষী নেতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝেও বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।
তবে সভাপতি পদের দৌড়ে আমান ও জিসান ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন আলোচিত নেতা রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের বর্তমান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম (২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষ)। এছাড়া খোরশেদ আলম সোহেল, মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, রিয়াদ রহমান, সাফি ইসলাম ও এজাজুল কবির রুয়েলের (২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষ) নামও জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে। এই পদের জন্য আরও আলোচনায় রয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আরিফ, প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন (২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষ), সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, সহসভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ আদনান।
সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য শেখ তানভীর বারী হামিম ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন যোগ্য নেতা আলোচনায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তারিক, সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক এবং মাসুম বিল্লাহ (২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ)। এছাড়া ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, শামীম আখতার শুভ, গাজী সাদ্দাম হোসেন, ইব্রাহিম খলিল এবং তারেক হাসান মামুনের (২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ) নামও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা জানিয়েছেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় নতুন কমিটি গঠনে জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা, শিক্ষার্থীবান্ধব ইমেজ এবং যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সাংগঠনিক দক্ষতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন পর নতুন কমিটি গঠন হতে যাচ্ছে বলে সারা দেশের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। তৃণমূল কর্মীদের প্রত্যাশা, জুলাই আন্দোলনে যারা রাজপথে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, সেই পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতারাই যেন ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনের হাল ধরেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে খুব শিগগিরই নতুন কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
প্রসঙ্গত, এরই মধ্যে বিদায়ী বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পৃথকভাবে বিদায়ের বার্তা দেন তারা। নিজেদের পোস্টে দুজনই ওইদিনকে ‘দায়িত্ব পালনের শেষদিন’ বলে উল্লেখ করেন। এর আগে, রাজধানীর গুলশানে তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তার সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয় ছাত্রদলের শীর্ষ পাঁচ নেতার। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে গঠন করা হয়েছিল ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি।











