ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ এবং কঠোর অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ জোরদার করা হলেও, দেশটির অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তেলের রফতানি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। দশকের পর দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তেহরান তেল পরিবহনের জন্য গড়ে তুলেছে এক অত্যন্ত গোপন ও জটিল নেটওয়ার্ক, যা বিশ্বজুড়ে ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ‘ছায়া বহর’ নামে পরিচিত। মূলত পুরনো, জরাজীর্ণ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ প্রকাণ্ড তেলবাহী জাহাজ বা ট্যাংকারে গঠিত এই বহরটি আইনি অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে এবং মার্কিন নজরদারি এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেল পৌঁছে দিচ্ছে।

এই ছায়া বহরের কার্যক্রম অত্যন্ত রহস্যময় এবং সুপরিকল্পিত। আধুনিক সামুদ্রিক নজরদারি ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে এসব জাহাজ প্রায়শই তাদের স্বয়ংক্রিয় অবস্থান শনাক্তকারী প্রযুক্তি (Automatic Identification System - AIS) বন্ধ রাখে অথবা কৃত্রিমভাবে ভুল অবস্থান সম্প্রচার করে। কর ফাঁকি দেওয়া এবং শিথিল আইনি ব্যবস্থার সুবিধা নিতে এই জাহাজগুলো বারমুডা, লাইবেরিয়া, পানামা বা মার্শাল আইল্যান্ডসের মতো দেশগুলোর পতাকা ব্যবহার করে, যাকে সামুদ্রিক পরিভাষায় ‘ফ্ল্যাগ অব কনভিনিয়েন্স’ বলা হয়। এসব জাহাজের প্রকৃত মালিকানা সাধারণত ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত ইরানি ধনকুবের অথবা চীনসহ বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের আড়ালে ঢাকা থাকে, যাতে কোনোভাবেই সরাসরি তেহরানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা না যায়। সমুদ্রের মাঝপথে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের (Ship-to-Ship Transfer) মাধ্যমে কার্গোর প্রকৃত উৎস গোপন করে তা চূড়ান্ত গন্তব্যে পাঠানো হয়, যা আন্তর্জাতিক নজরদারির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনি দিক থেকে দেখলে, ইরানের ওপর জাতিসংঘের সরাসরি তেল নিষেধাজ্ঞার বাধ্যবাধকতা বর্তমানে না থাকায় এই বাণিজ্য আন্তর্জাতিক আইনে সরাসরি অবৈধ নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পরোক্ষ বা ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’-এর কারণে আন্তর্জাতিক মূলধারার শিপিং কোম্পানি এবং বড় ব্যাংকগুলো ওয়াশিংটনের শাস্তির ভয়ে ইরানি তেল পরিবহনে অংশ নিতে পারে না। এই চরম অর্থনৈতিক অবরুদ্ধ অবস্থাই তেহরানকে বিকল্প পথ হিসেবে এই ছায়া বহরের উদ্ভাবন ও প্রসারে বাধ্য করেছে।

ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। যদিও বেইজিং তার সরকারি নথিতে ইরান থেকে সরাসরি তেল আমদানির কথা স্বীকার করে না, বরং এই তেলকে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার তেল হিসেবে নথিভুক্ত করে আমদানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। প্রকৃতপক্ষে, চীনের শানডং প্রদেশের ছোট ছোট বেসরকারি পরিশোধনাগার, যাদের ‘টিপট রিফাইনারি’ বলা হয়, তারা বিপুল পরিমাণ ছাড়ের বিনিময়ে এবং চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ইরানি অপরিশোধিত তেল কিনে থাকে। চীনের বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে পিছিয়ে থাকলেও, এই স্বাধীন রিফাইনারিগুলোই বর্তমানে ছায়া বহরের মূল গ্রাহক হিসেবে কাজ করছে।

তবে এই ছায়া বহরের ক্রমবর্ধমান আনাগোনা আন্তর্জাতিক জলসীমায় মারাত্মক পরিবেশগত ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব জাহাজের অধিকাংশেরই বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের বেশি, ফলে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তেল লিক হয়ে সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত প্রবল। ট্র্যাকিং সিগন্যাল বন্ধ রেখে চলাচলের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত নৌ-সংঘর্ষের আশঙ্কাও বেড়ে গেছে। এর একটি ভয়াবহ উদাহরণ ছিল ২০১৮ সালে চীনের উপকূলে ইরানি সানিচি ট্যাংকারের সংঘর্ষ ও ডুবে যাওয়ার ঘটনা, যা পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করেছিল।

বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তার পশ্চিমা মিত্ররা সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করে এই ছায়া বহরকে অকার্যকর করতে তৎপরতা বাড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে জাহাজের নিবন্ধন বা ফ্ল্যাগ বাতিল করিয়ে সেগুলোকে আইনগতভাবে অরক্ষিত ঘোষণা করা এবং জব্দের নীতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ছোট পরিশোধনাগারগুলোর ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে। তবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া এসব একতরফা মার্কিন পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে বেইজিং প্রত্যাখ্যান করেছে, যার ফলে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপ কেবলই বাড়ছে।