আইনি জটিলতা এবং ভারতীয় দূতাবাসের চরম দায়িত্বহীনতার কারণে গত দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রমেক) মর্গে পড়ে আছে ভারতীয় নাগরিক প্রবীর মন্ডলের মরদেহ। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় এবং হিমঘরের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও বিল পরিশোধ না হওয়ায় মরদেহটি এখন আর হিমঘরে নেই, বরং একটি ট্রলিতে রাখা হয়েছে। পচন ও অবহেলার কারণে মরদেহটি বর্তমানে প্রায় কঙ্কালসদৃশ হয়ে পড়েছে। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান এই মর্মান্তিক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালে। পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফেসবুকের মাধ্যমে বাংলাদেশের ময়মনসিংহের এক নারীর সঙ্গে পরিচয় হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নিমচা মৈত্রী স্ট্রিটের বাসিন্দা প্রবীর মন্ডলের। প্রেমের সম্পর্কের টানে এবং প্রিয়তমার সঙ্গে দেখা করার আকুলতা থেকে নভেম্বর মাসে তিনি লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে দহগ্রামে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। সেখানে এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থানকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য তার মরদেহটি পাঠানো হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ২০২১ সালের ১০ নভেম্বর একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হলেও এরপর থেকেই দীর্ঘ পাঁচ বছরের এক অন্তহীন প্রতীক্ষায় পড়ে আছে প্রবীর মন্ডলের দেহ।
মরদেহটি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক স্তরে নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর লালমনিরহাট জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে পুলিশ সদর দফতরে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। সেখানে বিজিবির মাধ্যমে বিএসএফ-এর সঙ্গে পতাকা বৈঠক করে মরদেহটি ভারতে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই উদ্যোগটি বাস্তবে রূপ নেয়নি। হিমঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বৈদ্যুতিক বিপর্যয়সহ নানা যান্ত্রিক ও প্রশাসনিক কারণে মরদেহে পচন ধরতে শুরু করেছে। বর্তমানে মরদেহটি এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে তা শনাক্ত করা বা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পুলিশ বলছে, হিমঘরের ভাড়া বা বিল পরিশোধের ব্যবস্থা না থাকায় লাশটি এখন হিমঘরে নয়, বরং একটি ট্রলিতে রাখা হয়েছে।
মরদেহটি নিয়ে সরকারি পর্যায়েও নানা তৎপরতা ছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রবীর মন্ডলের লাশ হস্তান্তরের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি পত্র প্রেরণ করা হয়। তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না হওয়ায় চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব স্বাক্ষরিত দ্বিতীয় আরেকটি চিঠি পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই দফা চিঠি দেওয়ার পরেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। অভিযোগ উঠেছে, ভারতীয় দূতাবাসের উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই এই দীর্ঘসূত্রতা এবং লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বলেন, প্রেমের সম্পর্কের টানে প্রবীর মন্ডল বাংলাদেশে এসে পাটগ্রামের বুড়িমারীতে এক আত্মীয়ের বাসায় ছিলেন। সেখানে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। এরপর একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়ের করা হলে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আইনি জটিলতার কারণে ২০২১ সাল থেকেই লাশটি সেখানে রয়েছে। বর্তমানে হিমঘরের নিয়মিত বিল পরিশোধ না হওয়ায় লাশটি হিমাগারে রাখা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে এটি একটি ট্রলিতে রাখা হয়েছে। পচন ও অবহেলার কারণে লাশটি এখন কঙ্কালসদৃশ হয়ে পড়ছে এবং অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। প্রতি মাসে থানা থেকে এসে পুলিশ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে এবং দ্রুত এর নিষ্পত্তি চায়।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, প্রবীর মন্ডলের মরদেহ ২০২১ সাল থেকে আমাদের এখানে পুলিশের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত আছে। যেহেতু ভারত সরকার এখনো মরদেহটি গ্রহণ করেনি, তাই গত ২১ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুনরায় চিঠি পাঠানো হয়েছে। সরকার ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে লাশ হস্তান্তরের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন হলেই আমরা মরদেহটি হস্তান্তর করতে পারব। অন্যদিকে, হিমঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল বসুনিয়া জানান, মরদেহটি এখনো সংরক্ষিত থাকলেও তাতে পচন ধরেছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেলেই ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনাটি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যাপক ফখরুল আনাম বেঞ্জু। তিনি বলেন, রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গের ফ্রিজিং সিস্টেম অত্যন্ত দুর্বল। এটি মূলত একটি স্টিলের বক্স ছাড়া আর কিছু নয়। দীর্ঘ সময় ধরে লাশটি এখানে থাকার ফলে তা কঙ্কাল হয়ে গেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যদি প্রবীর মন্ডলের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং তারা লাশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত সৎকার করা উচিত ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে লাশটি মর্গে ফেলে রাখা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
আইনজীবীরাও এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রংপুর জেলা জজ আদালতের আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ বলেন, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মৃতদেহকে যথাযথ সম্মান দেওয়া আমাদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মৃতদেহ সংরক্ষণ করা এবং সম্ভব হলে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা উচিত। পাঁচ বছর ধরে একটি মরদেহ এভাবে অবহেলার শিকার হওয়া আইনের চরম ব্যত্যয় এবং মৃতদেহের প্রতি চরম অবমাননা। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে এই সমস্যার সমাধান করা। যদি পরিবার লাশ নিতে অসমর্থ হয়, তবে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মৃতদেহটির যথাযথ সৎকার নিশ্চিত করতে হবে।
















