কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রখ্যাত লেখক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র পুত্র ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পুলিশ বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। এই ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে আটক তিনজনের মধ্যে মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ২০ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিন। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে সর্বশেষ তুহিনকেই দেখা গেছে। পরবর্তীতে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ এবং তুহিনের বাসা থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করার পর ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হয়। তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই আরও দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পরপরই পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত শুরু করে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সিসিটিভি ফুটেজগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হয়। সেই ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা যাওয়ায় তাকে সন্দেহ করা হয় এবং শনিবার দুপুরে তাকে আটক করা হয়। তুহিনের সাথে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ শাহরিয়া আনাস এবং মো. ফাহিম নামে আরও দুই কিশোরকে আটক করে, যাদের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। পুলিশের ভাষ্যমতে, জিজ্ঞাসাবাদ থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং উদ্ধার হওয়া আলামত বিশ্লেষণ করে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে এই তিনজনেরই সরাসরি সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তদন্তের গভীরে যেতেই বেরিয়ে এসেছে প্রধান অভিযুক্ত তুহিনের অন্ধকার জীবন। তুহিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সালমানপুর-সানন্দা এলাকার নুরে আলমের ছেলে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এলাকায় তুহিনের এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল চুরি, পথচলতি মানুষের টাকা ছিনিয়ে নেওয়াসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তুহিন ও ফাহিম এই এলাকায় দুটি পৃথক কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিত। অপ্রতিমের সঙ্গেও তাদের মাঝে চলাফেরা ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তুহিনের সঙ্গে 'নীরব' নামে আরও একজনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং তারা দলবদ্ধভাবে মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়াতেন।
তুহিনের অপরাধের ধরন ছিল আরও সুপরিকল্পিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোটরসাইকেল বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করত। ক্রেতারা যখন টাকা নিয়ে তার সাথে দেখা করতে আসত, তখন অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নিত। এই ধরনের অপরাধের ইতিহাস দীর্ঘ। জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলার আবেদন করা হয়েছিল, যদিও পরবর্তীতে তা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে গ্রহণ করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোটবাড়ি ফাঁড়ির পুলিশের সহায়তায় তুহিন আইনি জটিলতা থেকে মুক্তি পেয়েছিল, যদিও এই বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকায় তুহিনকে 'প্রভাবশালী' হিসেবে গণ্য করা হতো। তার বাবা দীর্ঘদিন বিদেশে কর্মরত ছিলেন এবং বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন। স্থানীয়দের দাবি, পরিবারের সদস্যরা তুহিনের এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত থাকলেও তাকে নিবৃত্ত করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। তুহিনের এই প্রভাবের প্রকৃত উৎস কী, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়া গেলেও স্থানীয়রা মনে করেন, অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিই তাকে সাহসী করে তুলেছিল। ফলে এলাকার অনেক কিশোর তার প্রভাবে ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তুহিনের পরিবার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
ঘটনার দিন যেভাবে নিখোঁজ হয় অপ্রতিম, তা বর্ণনা করে পরিবারের সদস্যরা জানান, গত শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে অপ্রতিম বাড়ি থেকে হেঁটে বের হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও সে আর ফিরে আসেনি। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। অবশেষে নিরুপায় হয়ে বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। নিখোঁজের পর তীব্র উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয় সময়। অবশেষে শনিবার দুপুর ১টার দিকে সানন্দা পাহাড়ি এলাকার দুর্গম একটি স্থান থেকে অপ্রতিমের নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার পর রাতে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নিহত অপ্রতিম কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম এবং ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। যে স্থান থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই সানন্দা পাহাড়ি এলাকাটি তুহিনের বাবা নুরে আলমের মালিকানাধীন বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। সেখানে তাদের একটি ঘরও রয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ প্রাথমিক ধারণা পেয়েছে যে, তুহিনই অপ্রতিমকে প্রলুব্ধ করে ওই নির্জন এলাকায় নিয়ে গিয়েছিল। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, সানন্দা পাহাড়ি এলাকাটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার এবং অপ্রতিমের বাড়ি থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
















