শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পর্যালোচনা করছে ভারত, তদন্ত চলছে হাদি হত্যা মামলার

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধটি ভারত তাদের নির্ধারিত নিয়ম ও আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে। মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণের বিষয়টি বর্তমানে যথাযথ কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং ভারত এই বিষয়ে সতর্ক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। একইসঙ্গে শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার সন্দেহভাজনদের শনাক্তকরণ ও তাদের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে জয়সওয়াল আরও জানান, সম্প্রতি ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ সাক্ষাৎ করেছেন। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কৌশলগত ও দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক এবং বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।

সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, "সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণ এবং হাদি হত্যা মামলা—এই দুটি সংবেদনশীল বিষয়েই আপনারা জানতে চেয়েছেন। প্রথমত, হাদি হত্যা মামলাটি সম্পূর্ণ একটি আইনি প্রক্রিয়া এবং বর্তমানে এ নিয়ে নিবিড় তদন্ত চলছে। আর শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে আমাদের অবস্থান ইতিপূর্বে পরিষ্কার করা হয়েছে; আমরা আমাদের দেশের প্রচলিত নির্ধারিত আইনি কাঠামো ও প্রক্রিয়া মেনেই বিষয়টি পর্যালোচনা করছি। এই প্রক্রিয়ায় কোনো তাড়াহুড়ো না করে আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে।"

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর মধ্যকার ফলপ্রসূ বৈঠকের ঠিক একদিন পরেই ভারতের পক্ষ থেকে এই আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এলো। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয় যে, বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে আশা করে ভারত দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। এর পাশাপাশি, শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজনদেরও দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভারতের কাছ থেকে ফেরত দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলাটির প্রেক্ষাপট অত্যন্ত মর্মান্তিক ও স্পর্শকাতর। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন রোডে রিকশায় যাওয়ার সময় একদল আততায়ী চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে হাদির মাথায় সরাসরি গুলি করে। এই নৃশংস হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। তবে সেখানে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে বাংলাদেশ পুলিশ সন্দেহভাজনদের আন্তর্জাতিকভাবে খোঁজার চেষ্টা শুরু করে এবং ভারতের সাথে সমন্বয় স্থাপন করে।

চলতি বছরের শুরুতে কলকাতা পুলিশের তথ্যের বরাত দিয়ে কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন জানায়, ফয়সাল করিম মাসুদ (৩৭) এবং আলমগীর হোসেন (৩৪) নামে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে ভারতীয় পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো এই দুই ব্যক্তিকে শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করে। এই খবরটি প্রকাশ পাওয়ার পরপরই বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন কলকাতার ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপন করে। পাশাপাশি, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সাক্ষাতের সুযোগ বা 'কনস্যুলার অ্যাক্সেস' প্রদানের জন্য জোরালো অনুরোধ জানানো হয়, যাতে তাদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করা যায় এবং তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বলে অভিহিত করেছেন ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে বিভক্ত নয়, বরং দুই দেশ একে অপরের স্বপ্ন, সংস্কৃতি ও আকাঙ্ক্ষাও ভাগ করে নেয়। এই সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বন্ধনই দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি।

বৈঠকের পর ভারতের হাইকমিশন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স'-এ এক বার্তায় জানায়, বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজ করতে ভারত গভীরভাবে আগ্রহী। হাইকমিশনের ওই পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয় যে, দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেছে এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী, টেকসই ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে তোলার বিভিন্ন উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে এই বার্তায় জানানো হয়।