সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে তার গলায় রামদা ধরে বাড়ি ও সম্পত্তির দলিলে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় তার তিন সৎ ভাইসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত সোমবার সংসদ সদস্যের স্ত্রী পারভিন আক্তার বাদী হয়ে দিরাই আদালতে এই মামলাটি দায়ের করেন। আদালতের বিচারক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন মামলাটি গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়েছেন এবং পুরো বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী মোহিত লাল চন্দ সংবাদমাধ্যমকে মামলা দায়ের এবং আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মামলায় যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে তারা হলেন—নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সৎ ভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী, মিজানুর রহমান চৌধুরী ও মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরী। এছাড়া দিরাই উপজেলার মাতারগাঁও গ্রামের মৃত নাজমুল ইসলামের ছেলে আমিরুল ইসলাম, পুরাতন কর্ণগাঁও গ্রামের আব্দুন নুর মিয়ার ছেলে ছয়ফুল চৌধুরী, তল বাউসী গ্রামের দলিল লেখক মুজিবুর রহমান, কলিয়ার কাপন গ্রামের নাজমুল ইসলামের ছেলে তাজুল ইসলাম এবং দিরাইয়ের নুরুল ইসলামের মেয়ে মোহরার মমতাজ বেগম।

মামলার আরজিতে পারভীন আক্তার বিস্তারিত অভিযোগ করেছেন যে, তার স্বামী নাছির চৌধুরী (৭৫) দীর্ঘ সময় ধরে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ ছিলেন এবং মানসিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও অবুঝ হয়ে পড়েছিলেন। এই সুযোগটিই কাজে লাগান তার তিন সৎ ভাই। তারা পরিকল্পনা করেন যে, নাছির চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার বৈধ স্ত্রী ও সন্তানদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে সেই সম্পদ নিজেদের নামে করে নেবেন। এই উদ্দেশ্যেই তারা অসুস্থ সংসদ সদস্যের গলায় রামদা ধরে হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক বাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তির দলিলে স্বাক্ষর করিয়ে নেন।

ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে পারভীন আক্তার জানান, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি ঢাকা থেকে অসুস্থ স্বামীকে দেখতে দিরাইয়ের বাড়িতে গেলে সেখানে তাকে মারপিট ও শ্লীলতাহানির শিকার হতে হয়। এরপর তিনি অসুস্থ নাছির চৌধুরীকে তার প্রথম স্ত্রী নিঃসন্তান শেলী চৌধুরী ও বোন শামীমা চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে রেখে যান। তবে সেই সময়ে শেলী ও শামীমা চৌধুরীও অসুস্থ ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৫ জানুয়ারি আসামিরা দিরাই সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দুই কর্মচারীকে কর্মকর্তা সাজিয়ে কৌশলে বাড়িতে নিয়ে আসেন। তারা অসুস্থ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নাছির চৌধুরীকে দলিলে সই করতে চাপ দেন। কিন্তু তিনি তাতে অসম্মতি জানান। এরপরই পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে; আসামিরা তার গলায় রামদা ধরে হুমকি দেন যে, সই না করলে তার গলা কেটে হত্যা করা হবে। এই সময় স্ত্রী শেলী চৌধুরী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। চরম আতঙ্কে শেষ পর্যন্ত নাছির চৌধুরী দলিলে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।

পারভীন আক্তার আরও দাবি করেন, পরবর্তীতে তিনি পুলিশের সহায়তায় নাছির চৌধুরীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যান। সেখানে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর সংসদ সদস্য তাকে জোরপূর্বক সই করিয়ে নেওয়ার পুরো বিষয়টি জানান। এই ঘটনা জানাজানি হলে এবং স্থানীয়ভাবে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে অভিযুক্তরা প্রথমে ক্ষমা চান এবং দ্রুত দলিল বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তারা এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। উল্লেখ্য, ঘটনার পর থেকে শেলী চৌধুরী ও শামীমা চৌধুরী উভয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন।

এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে মামলার অন্যতম আসামি মঈন উদ্দিন চৌধুরী এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “দলিল রেজিস্ট্রি করার কাজ করেন সাবরেজিস্ট্রার। আমার বোন এবং নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ‘প্রকৃত’ স্ত্রী এই বিষয়ে অবগত ছিলেন। মামলাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না, তবে জানার পর আইনিভাবেই এর জবাব দেব।” উল্লেখ্য, নাছির উদ্দিন চৌধুরী সুনামগঞ্জ-২ আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।