বাল্যবিয়ে ও পারিবারিক কলহ: ধর্ষণের মামলায় কারাবন্দি যুবক

ফরিদপুরের নগরকান্দায় সামাজিক রীতি মেনে বিয়ের পর দাম্পত্য কলহের জেরে এখন আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছেন এক যুবক। গায়ে হলুদ, নাচ-গান এবং ৪০ জন বরযাত্রীর জমকালো উপস্থিতিতে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি মেনে বিয়ে সম্পন্ন হলেও, এখন কনেপক্ষের দাবি—‘কোনো বিয়েই হয়নি’। এই পরস্পরবিরোধী দাবির মাঝে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গত দেড় মাস ধরে কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন ২০ বছর বয়সী রুমন খন্দকার। পেশায় কাঠমিস্ত্রি এই যুবক বর্তমানে আইনি জটিলতার মুখে পড়েছেন, যেখানে একদিকে সামাজিক বিয়ের প্রমাণ আর অন্যদিকে ধর্ষণের গুরুতর অভিযোগ। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

ঘটনাটি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের। রুমন খন্দকার ওই গ্রামের বিল্লাল খন্দকারের ছেলে। শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

ভুক্তভোগীর পরিবার এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ মে পারিবারিকভাবে ডাঙ্গী ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের মিরাজ মাতুববরের মেয়ে মিলা আক্তারের (১৫) সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন রুমন। বিয়ের আয়োজনটি ছিল বেশ জমকালো। তবে কনের বয়স অপ্রাপ্ত হওয়ায় পরিবারের কথা ছিল, মেয়েটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বিয়ের আইনি নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হবে। বিয়ের পর কনেকে নিয়ে বরের বাড়িতে যাওয়া হয় এবং সেখানে তারা দাম্পত্য জীবন শুরু করেন। এই বিয়ের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতির প্রমাণ হিসেবে ভিডিও ও ছবি রুমনের পরিবার সাংবাদিকদের সরবরাহ করেছে।

রুমনের মামা হাফিজুর রহমান জানান, বিয়ের শুরুর দিকে সবকিছু ঠিক থাকলেও খুব দ্রুতই কনের সঙ্গে রুমনের মনোমালিন্য শুরু হয়। পরবর্তীতে তারা জানতে পারেন, বিয়ের আগে থেকে ওই কিশোরীর সঙ্গে অন্য এক তরুণের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এই বিষয়টি নিয়ে পারিবারিক কলহ চরম আকার ধারণ করে এবং বিয়ের কিছুদিন পর কনে তার বাবার বাড়িতে ফিরে যান। এরপর তিনি আর ফিরে আসতে চাননি। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় একবার তাকে ফিরিয়ে আনা হলেও, কয়েকদিন পর তিনি পুনরায় বাবার বাড়িতে চলে যান এবং এরপর থেকে রুমনের পরিবারের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এর প্রায় এক মাস পর, গত ২ জুলাই গভীর রাতে পুলিশ হঠাৎ রুমনকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে পরিবার জানতে পারে, রুমনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছেন কনের দাদি জহুরন খাতুন। মামলায় আদালতে শুনানি হলেও রুমনের পরিবারের দাবি, বিচারক তাদের কথা শুনেননি। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে যে, গত ১৯ জুন বিকেল ৫টায় বাড়ির পাশ থেকে নাতনি মিলাকে একটি মাইক্রোবাসে করে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর রুমন খন্দকারদের বাড়িতে তাকে আটকে রেখে রাতভর ধর্ষণ করা হয় এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করা হয়। পরের দিন সকালে কৌশলে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে কিশোরীটি তার পরিবারকে সব খুলে বলে। এরপর তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসা দেওয়া হয়।

বিষয়টি নিয়ে কিশোরী মিলা এবং বাদী জহুরন খাতুনের সঙ্গে কথা বলা হলে তারা স্পষ্টভাবে দাবি করেন যে, তাদের মধ্যে কোনো বিয়ে হয়নি। তারা এজাহারে বর্ণিত ঘটনার সত্যতা দাবি করেন এবং ধর্ষণের ঘটনায় কঠোর বিচারের আবেদন জানান। তবে বিয়ের প্রমাণ হিসেবে প্রদর্শিত ছবি ও ভিডিওর বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং বিষয়টি এড়িয়ে যান।

নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ জানান, গত ২ জুলাই জহুরন খাতুন তার নাতিকে নিয়ে থানায় এসে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসি সেন্টারের চিকিৎসার ছাড়পত্রে ধর্ষণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। সেই অভিযোগ ও মেডিকেল রিপোর্টের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে। ওসি আরও জানান, মামলার এজাহারে বিয়ের কোনো উল্লেখ নেই এবং পুলিশকেও আগে এই বিষয়ে জানানো হয়নি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, মেয়েটির বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় সরকারিভাবে বিয়ের কোনো সুযোগ নেই এবং সামাজিক বিয়ে আইনগতভাবে সিদ্ধ নয়। মেডিকেল রিপোর্ট ও অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে পুলিশ মামলাটি গ্রহণ করেছে। বর্তমানে উপ-পরিদর্শক শহিদুল ইসলামকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত শেষে আদালতে পুলিশি প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

ফরিদপুর জজ কোর্টের আইনজীবী মো. ফারুক হোসেন এই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের দেশে দুই পরিবার এবং ছেলে-মেয়ের সম্মতিতে অহরহ বাল্যবিয়ে হচ্ছে, এখানেও তেমনটাই ঘটেছে। পারিবারিকভাবে বিয়ের পর তারা সংসার করেছেন, কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে এই বিবাহ স্বীকৃত নয়। আর এই আইনি শূন্যতার সুযোগ নিয়ে পারিবারিক কলহের জেরে ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগে ছেলেটিকে কঠিন মামলার মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছে, যা সত্যিই অমানবিক।’ তিনি আরও যোগ করেন, এটি কেবল রেজিস্ট্রেশনহীন বিবাহের সমস্যা নয়, বরং নৈতিকতার চরম অবক্ষয়। প্রকাশ্যে সংসার করার পর তুচ্ছ কারণে আইনের সুযোগ নিয়ে কাউকে ফাঁসানো নৈতিক পরাজয়ের লক্ষণ। এই ধরনের মামলাগুলো আইনজীবীদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে, নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, সামাজিক ও আইনি সুরক্ষার জন্য বিয়ের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এখানে উভয় পক্ষই প্রথমে অবৈধ কাজ করেছে; বাল্যবিয়ে আড়াল করতে তারা নিবন্ধন করেননি। এখন পারিবারিক কলহের জেরে কনেপক্ষ সেই আইনি ত্রুটির সুযোগ নিচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বিয়েতে যদি কোনো নিবন্ধক বা কাজীর সংশ্লিষ্টতা থাকে, তবে তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।