কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে ঘিরে বেরিয়ে এসেছে এক অভাবনীয় ‘আয়নাবাজি’র গল্প। মামলার নথিতে যাকে ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে আসামি করা হয়েছিল এবং যার বিরুদ্ধে আদালতের চূড়ান্ত রায় এসেছে, তিনি আসলে ওই মামলার প্রকৃত আসামি নন। পুলিশের সাম্প্রতিক তদন্তে জানা গেছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিটি পুলিশ ও আদালতের কাছে নিজেকে সোনা মিয়া বলে পরিচয় দিলেও তাঁর প্রকৃত নাম ছিল রমজান। তিনি অন্য এক ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজের পরিচয় গোপন করেছিলেন এবং সেই ভুয়া পরিচয়েই মামলা, জামিন ও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আর এর ফলে প্রকৃত সোনা মিয়া নিজের অজান্তেই এক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিতে পরিণত হন।
ঘটনাটি আরও জটিল রূপ নেয় ২০২৬ সালের ২৩ জুন। ওই দিন র্যাব-১৫-এর একটি বিশেষ অভিযানে ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে প্রকৃত সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। তবে কারাগারে যাওয়ার মাত্র দুই-তিন দিনের মাথায় সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের ওই মামলার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই এবং তিনি এই অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। এই অভিযোগের পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আদালতের নজরে আসে। আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ পুনরায় তদন্ত শুরু করে এবং গত ২ জুলাই একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করে। পুলিশের সেই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।
এই পুরো নাটকের শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের ২ মার্চ। ওই দিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলার এজাহারে ২ নম্বর আসামি হিসেবে নাম লেখা হয় ‘সোনা মিয়া’র। এজাহারে তাঁর বাবার নাম নজির আহমদ, বর্তমান ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়। পুলিশের নথিতে বলা হয়, গ্রেপ্তারের সময় ওই ব্যক্তির কাছ থেকে একটি জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি পাওয়া গিয়েছিল, যার সূত্র ধরেই তাঁর নাম সোনা মিয়া হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তদন্তে এই পরিচয়ের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
মামলার তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, ২ নম্বর আসামি সোনা মিয়ার নাম ও ঠিকানা যাচাই করতে কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশকে দিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল। কিন্তু সেই অনুসন্ধানে তাঁর দেওয়া নাম ও ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি। তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে আরও অনুরোধ করেছিলেন, আসামির সঠিক পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় তাঁকে জেলহাজতে রেখে পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য। অর্থাৎ, মামলার একদম প্রাথমিক তদন্ত পর্যায়েই পুলিশের কাছে আসামির পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সেই সন্দেহের জট খোলার চেষ্টা করা হয়নি এবং প্রকৃত পরিচয় বের করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
পরিচয় নিয়ে চরম অস্পষ্টতা থাকা সত্ত্বেও বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যেতে থাকে। ২০২২ সালের ১৩ জুন কক্সবাজার জেলা জজ আদালত থেকে জামিন পান সেই ‘ভুয়া’ সোনা মিয়া (প্রকৃত রমজান)। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরপরই তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত এই মামলায় সোনা মিয়াসহ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ ও র্যাব অভিযান শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর একজন সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসারের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে প্রকৃত সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাগারে যাওয়ার পরই পুরো ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। প্রকৃত সোনা মিয়ার আবেদনের পর পুলিশ যখন পুনরায় তদন্ত করে, তখন বেরিয়ে আসে এক বিস্ময়কর সত্য। পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিটি আসলে রমজান নামের এক ব্যক্তি। তদন্তে জানা গেছে, রমজান এবং প্রকৃত সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরবর্তীতে তাঁরা ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় দীর্ঘ সময় একই ঘরে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করেন। সেই সময়ে কোনো এক পর্যায়ে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের কাগজ রমজানের কাছে থেকে যায়। ২০২০ সালের ডিবি পুলিশের অভিযানে যখন রমজান ধরা পড়েন, তখন তিনি নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন এবং তাঁর কাছে থাকা ওই জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি দেখান। পুলিশের গাফিলতির কারণে সেই পরিচয়ই মামলার এজাহার এবং পরবর্তী সমস্ত আইনি নথিতে চলে যায়। ফলে অপরাধটি করেছে রমজান, কিন্তু কাগজে-কলমে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে যান নিরপরাধ সোনা মিয়া।
এই অসামঞ্জস্যতা আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় কারাগারে সংরক্ষিত দুই সময়ের নথি এবং ছবির তুলনামূলক বিশ্লেষণে। কারাগার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির ছবি এবং ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার ছবির মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। শুধু ছবিই নয়, দুই ব্যক্তির শারীরিক গঠন এবং পারিবারিক পরিচয়েও রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির নথিতে বাবার নাম মৃত নজির আহমদ, মায়ের নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে থাকার কথা বলা হয়, যার মধ্যে বড় ছেলের নাম মোহাম্মদ আলী। তাঁর উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, ওজন ৫০ কেজি এবং গায়ের রং শ্যামলা। শারীরিক চিহ্ন হিসেবে তাঁর বাম গালে, ডান গালে এবং ডান বাহুতে ক্ষত থাকার কথা উল্লেখ ছিল।
অন্যদিকে, ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া প্রকৃত সোনা মিয়ার নথিতে বাবার নাম মৃত নজির আহমদ হলেও মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তাঁর এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলের নাম ওমর ফারুক এবং মেয়ের নাম নাহিদা। তাঁর উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, ওজন ৪২ কেজি এবং গায়ের রং শ্যামলা। শারীরিক চিহ্ন হিসেবে তাঁর ডান বাহুতে তিল, পেটের বাম পাশে তিল এবং পিঠের মাঝখানে তিল থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, একই বাবার নাম থাকলেও মা, স্ত্রী, সন্তান, উচ্চতা, ওজন এবং শারীরিক শনাক্তকরণ চিহ্নে রয়েছে বিশাল পার্থক্য। তা সত্ত্বেও পুলিশ ও আদালত দীর্ঘ সময় ধরে এই পার্থক্যগুলো এড়িয়ে গেছে।
এই ঘটনায় তদন্ত প্রক্রিয়া এবং জামিন দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে যখন স্পষ্টভাবে বলা ছিল যে আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি, তখন কেন তাঁকে মুক্তি দেওয়া হলো বা কেন পরিচয় নিশ্চিত করা হলো না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনজীবীদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনার দাবি রাখে। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, মামলা দায়ের থেকে শুরু করে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গাফিলতি ছিল। তাঁর মতে, জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে অন্য কেউ পরিচয় দিলে তা যাচাই করে প্রকৃত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা তদন্ত কর্মকর্তার প্রাথমিক দায়িত্ব। কিন্তু এখানে সেই দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করা হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত অপরাধী জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপন করার সুযোগ পেয়েছেন এবং একজন নিরপরাধ মানুষ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে বন্দি হয়েছেন।
প্রকৃত সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস এই ঘটনায় অত্যন্ত মর্মাহত। তিনি জানান, তাঁদের বাড়ি মহেশখালীতে। আগে তাঁরা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকতেন এবং পরে চকরিয়ার ডুলহাজারায় চলে যান। তাঁর দাবি, তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে আগে কোনো মামলা ছিল না এবং তিনি কখনো কারাগারে যাননি। হঠাৎ র্যাব তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁরা জানতে পারেন যে, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় তাঁর স্বামীর নাম রয়েছে। তিনি আরও জানান, তাঁর স্বামী রোহিঙ্গা নন, বরং রামুর স্থায়ী বাসিন্দা। কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকার সময় রমজান নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল। জান্নাতুল ফেরদৌসের দাবি, সেই রমজানই ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং তারা ভেবেছিলেন রমজানই কারাগারে আছেন। এখন জানতে পেরেছেন যে, রমজান তাঁর স্বামীর নাম ব্যবহার করে আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে গেছেন। তিনি এখন আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করছেন।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী আদালতের নির্দেশে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এখন দেখার বিষয়, আদালতের চূড়ান্ত আদেশে এই নিরপরাধ ব্যক্তি কীভাবে মুক্তি পান এবং প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় কি না। বুধবার (১২ আগস্ট) এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত আদেশ দেওয়ার কথা রয়েছে, যার দিকে তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।











