জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো নির্মম দমন-পীড়নের খবর যাতে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য পরিকল্পিতভাবে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ প্রসিকিউশনের মাধ্যমে উপস্থাপন করা একটি কল রেকর্ডে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। সোমবার (১০ আগস্ট) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে প্রমাণ হিসেবে এই কল রেকর্ডটি দাখিল করা হয়। ওবায়দুল কাদেরসহ মোট সাতজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার যুক্তিতর্কের চতুর্থ দিনে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।
প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, ওই কল রেকর্ডে ওবায়দুল কাদেরকে স্পষ্টভাবে শোনা যায় যে, তিনি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছিলেন। বিশেষ করে সংঘাতের খবর যাতে কোনোভাবেই প্রচার হতে না পারে, সে বিষয়ে তিনি তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে কঠোর নির্দেশনা দেন। জবাবে প্রতিমন্ত্রী আরাফাত জানান, তার নির্দেশনার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে এবং আগের দিনই বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যারা এই নির্দেশনা মানতে অস্বীকার করবে, তাদের চ্যানেলগুলোও তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
কথোপকথনের আরও এক পর্যায়ে আরাফাত জানান, সংঘাতের কোনো ছবি, ভিডিও বা ফুটেজ প্রচার করলে সংশ্লিষ্ট চ্যানেলকে ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’ বা রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার কার্যক্রম নিবিড়ভাবে নজরদারির ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন তিনি। কল রেকর্ড অনুযায়ী, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী আরাফাত পরিস্থিতির একটি বিশেষ ব্যাখ্যা দিয়ে ঘটনাটিকে দুটি ভাগে উপস্থাপনের কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি ওবায়দুল কাদেরকে জানান, একদিকে কোটা আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীরা এবং অন্যদিকে ‘তৃতীয় পক্ষ’ হিসেবে জামায়াত-বিএনপির লোকজন সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগ করছে—এই বয়ানটি প্রচার করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, কারফিউর সিদ্ধান্তটিকে জামায়াত-বিএনপির তথাকথিত ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপিত করা হচ্ছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়াও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত। এর আগে রোববার (৯ আগস্ট) মামলার যুক্তিতর্কের তৃতীয় দিনে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের আরেকটি কল রেকর্ড ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, ওই রেকর্ডে গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দিয়ে জনযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তবে পলক তাকে জানিয়েছিলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
প্রসিকিউশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলার এই সাত আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত ২ আগস্ট মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়, যেখানে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জন সাক্ষী তাদের সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। বর্তমানে মামলাটির চূড়ান্ত পর্যায় হিসেবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে।











