বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় এবং দাপুটে নাম আব্দুল খালেক জসিম। যাকে আমরা সবাই চিনি ‘অ্যাকশন কিং জসিম’ হিসেবে। আশির দশকের রুপালি পর্দায় তাঁর দাপট ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ভিলেন হিসেবে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এক অনন্য অ্যাকশন হিরো হিসেবে, যা তাঁকে করে তোলে সাধারণ মানুষের প্রিয় নায়ক। ক্যামেরার সামনে গুলি চালানো, বিস্ফোরণ ঘটানো কিংবা কঠিন লড়াইয়ের দৃশ্য—সবকিছুই তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজের হাতে করতেন। জসিমের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একজন প্রকৃত নায়ককে অবশ্যই সাহসী হতে হবে। তাঁর এই সাহসিকতা এবং ব্যক্তিত্বই তাঁকে পর্দার বাইরেও এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। আজ সেই কিংবদন্তি নায়ক জসিমের জন্মদিন।

১৯৪৫ সালের এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্সনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল খালেক জসিম। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল অদম্য সাহস এবং দেশপ্রেম। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশ স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াইয়ে নামে, তখন তরুণ জসিম দ্বিধাহীনভাবে হাতে অস্ত্র তুলে নেন। দেশ রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এই সাহসী যুবক। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে তিনি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং বুক ভরা সাহস নিয়ে লড়াই করেছিলেন শত্রুর বিরুদ্ধে। যুদ্ধের সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং বীরত্বই হয়তো পরবর্তীতে তাঁর অভিনয়ের মধ্যে এক বিশেষ গাম্ভীর্য এবং বিশ্বাসযোগ্যতা এনে দিয়েছিল।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেই সাহসী তরুণের জীবন মোড় নেয় অন্য পথে। তিনি প্রবেশ করেন চলচ্চিত্রের রঙিন দুনিয়ায়। সত্তরের দশকের শুরুতে জসিমের সিনেমা জীবন শুরু হয়। ১৯৭২ সালে ‘দেবর’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি প্রথম অভিনয় শুরু করেন। তবে শুরুতেই তিনি নায়ক হিসেবে আসেননি; তাঁর অভিষেক ঘটেছিল খলনায়ক হিসেবে। পর্দায় তাঁর ভয়ংকর দৃষ্টি এবং গম্ভীর কণ্ঠস্বর দর্শকের মনে ত্রাস সৃষ্টি করত। পরের বছর ১৯৭৩ সালে ‘রংবাজ’ সিনেমায় তিনি অ্যাকশন পরিচালক হিসেবে কাজ করেন, যা তাঁর কারিগরি দক্ষতার প্রমাণ দেয়। এরপর দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ সিনেমায় খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এই সিনেমাটি ছিল ভারতের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘শোলে’র আদলে নির্মিত। এতে জসিম অভিনয় করেছিলেন গাফফার চরিত্রে। তাঁর অভিনয় এতটাই বাস্তবসম্মত এবং শক্তিশালী ছিল যে, ‘শোলে’র গব্বর সিং চরিত্রে অভিনয় করা প্রখ্যাত অভিনেতা আমজাদ খানও জসিমের অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

তবে জসিম কেবল খলনায়ক হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন দর্শকের সামনে একজন নায়কের ইমেজ তৈরি করতে। ‘সবুজ সাথী’ সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর একের পর এক অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন দর্শকদের প্রিয় নায়ক। আশির দশকে শাবানা ও রোজিনার সঙ্গে তাঁর জুটি বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। পর্দায় তিনি প্রায়শই শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হতেন, যা সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর সিনেমার অ্যাকশন দৃশ্যগুলো পরিচালনা করত তাঁর নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ‘জ্যাম্বস ফাইটিং গ্রুপ’। এই সংস্থার মাধ্যমেই তিনি ঢাকাই সিনেমার প্রযোজক ও পরিচালকদের নজরে আসেন। বিশেষ করে ‘দোস্ত দুশমন’ ছবির সেই ভয়ংকর চরিত্রটি দর্শকদের মনে এতটাই গেঁথে গিয়েছিল যে, সিনেমা হলে প্রবেশের সময় অনেকে বলতেন, ‘আজ জসীমের মাইর খেতে যাচ্ছি।’

সময়ের পরিবর্তন হলেও জসিমের জনপ্রিয়তা এখনো অম্লান। বর্তমান যুগে ইউটিউব শর্টস কিংবা ফেসবুক রিলসে তাঁর অভিনয়, নাচ এবং মারপিটের দৃশ্যের ভিডিওগুলো এখনো দর্শক খুঁজে খোঁজেন। আজকের তরুণ প্রজন্ম তাঁর সংলাপগুলো অনুকরণ করে, তাঁকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মিম এবং ট্রল তৈরি হয়। এমনকি বিভিন্ন বিজ্ঞাপনেও তাঁর সাদৃশ্যপূর্ণ মডেল ব্যবহার করা হয়। ফেসবুকে প্রায়ই তাঁর ছবিসহ বিভিন্ন আইকনিক সংলাপ দিয়ে কার্ড শেয়ার করা হয়, যা প্রমাণ করে তিনি এখনো বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে আছেন।

অভিনয়ের বাইরে জসিমের আরেকটি বড় পরিচয় ছিল নতুন প্রতিভা অন্বেষণ করা। তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি অন্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা চিনতে পারতেন। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত এবং সফল আবিষ্কার নিঃসন্দেহে বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক রিয়াজ। রিয়াজ যখন চলচ্চিত্রে আসেননি, তখন তিনি বিমানবাহিনীতে বিমানচালক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত চাকরি হারিয়ে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। তাঁর চাচাতো বোন ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ববিতা। একদিন ববিতার সঙ্গে বিএফডিসিতে গিয়েছিলেন রিয়াজ। আর সেখানেই তাঁর সুদর্শন চেহারার প্রতি নজর পড়ে জসিমের। ১৯৯৪ সালের সেই আকস্মিক সাক্ষাৎ রিয়াজের জীবন বদলে দেয়। জসিমের মনে হয়েছিল, এই তরুণের মধ্যে একজন সফল নায়ক হওয়ার সব গুণ রয়েছে। তিনি রিয়াজকে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। তখন অভিনয়ের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও জসিমের প্রস্তাব এবং ববিতার উৎসাহে রিয়াজ চলচ্চিত্রে আসার সাহস পান।

পরের বছর ১৯৯৫ সালের ৩ মার্চ মুক্তি পায় ‘বাংলার নায়ক’ সিনেমাটি। এই ছবির মাধ্যমেই রিয়াজের চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। সিনেমাটিতে জসিম অভিনয় করেছিলেন ডন চরিত্রে, শাবানা ছিলেন রোকেয়া এবং রিয়াজ অভিনয় করেন মুন্না চরিত্রে। তবে জসিম কেবল সুযোগ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি; তিনি রিয়াজকে অভিনয় এবং অ্যাকশনের নানা জটিল কৌশল হাতে-কলমে শিখিয়েছিলেন। রিয়াজ পরবর্তীতে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, এফডিসিতে জসিমের শুটিং চলার সময় তিনি তাকে ফাইট প্র্যাকটিস করাতেন। এমনকি নিজের শুটিংয়ের সময়টুকুর বিনিময়েও জসিম তাকে ফাইট শিখিয়েছেন। রিয়াজ অকপটে স্বীকার করেছেন যে, জসিমের দিকনির্দেশনা এবং সহযোগিতার কারণেই তিনি আজ ‘নায়ক রিয়াজ’ হয়ে উঠতে পেরেছেন। জসিমের এই উদারতা ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ‘বাংলার নায়ক’র পর রিয়াজ খুব দ্রুতই নিজের জায়গা করে নেন এবং ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’সহ আরও অনেক সফল সিনেমার মাধ্যমে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়কে পরিণত হন।

জসিমের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রায় দুই শতাধিক ছবি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘তুফান’, ‘জবাব’, ‘নাগ-নাগিনী’, ‘বদলা’, ‘বারুদ’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘লালু মাস্তান’, ‘নবাবজাদা’, ‘অভিযান’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘গরিবের ওস্তাদ’, ‘রাজা বাবু’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘মেয়েরাও মানুষ’ এবং ‘বুকের ধন’ ইত্যাদি। এই ছবিগুলোর অধিকাংশেই ছিল শক্তিশালী সামাজিক বার্তা। দরিদ্র মানুষের সংগ্রাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, মায়ের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা এবং প্রেমের জন্য ত্যাগ—এই বিষয়গুলো তাঁর চরিত্রগুলোকে কেবল পর্দার নায়ক নয়, বরং বাস্তব জীবনের প্রতীকে পরিণত করেছিল।

বাস্তব জীবনেও জসিম ছিলেন একজন বীর। যুদ্ধের সাহসিকতার গল্পগুলো তিনি পরবর্তী প্রজন্মকে শোনাতেন। ভিলেন হিসেবে অভিনয়ের সময় শুটিংয়ের ফাঁকে তিনি সহকর্মীদের বলতেন, ‘দেশের জন্য গুলি খেয়েছি, এখন দর্শকের ভালোবাসার জন্য মার খাচ্ছি।’ তাঁর জীবনের এই বাস্তব বীরত্বই তাঁর অভিনয়কে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল। দর্শকের কাছে তাঁর প্রতিটি সংলাপ, লড়াই এবং আবেগ ছিল বাস্তবেরই এক প্রতিফলন। ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মাত্র ৪৮ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী আমাদের ছেড়ে চলে যান। তবে তাঁর রেখে যাওয়া কাজ এবং স্মৃতি আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।