রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)-র তহবিলে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও হিসাবের গরমিলের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন কর্মসূচির নামে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা হলেও তার বিপরীতে প্রয়োজনীয় বিল-ভাউচার জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন রাকসুর শীর্ষ নেতৃত্বসহ বেশ কয়েকজন সম্পাদক। রাকসুর কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের ব্যয়-সংক্রান্ত নথির বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।

নথি অনুযায়ী, চলতি মেয়াদে বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য রাকসুর তহবিল থেকে মোট ৪২টি খাতে ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল অংকের অর্থের মধ্যে প্রায় ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার কোনো বিল-ভাউচার এখনো জমা দেওয়া হয়নি। তহবিলের এই বিশাল অংকের অর্থ কোথায় ব্যয় হলো, তার কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ে।

তহবিল থেকে সর্বোচ্চ অর্থ উত্তোলনের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার। তার নামে সাতটি ভিন্ন ধাপে মোট ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা তোলা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে তিন ধাপের ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার ব্যয়ের কোনো ভাউচার জমা দেওয়া হয়নি। মূলত ভর্তি পরীক্ষার সময় বুথ স্থাপন, রাকসু সদস্যদের বাজেট এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক খরচের কথা বলে এই অর্থ নেওয়া হয়েছিল। এই বিষয়ে সালাহউদ্দিন আম্মার জানান, ভর্তি পরীক্ষার ব্যয়ের সঙ্গে ভ্যাট যোগ করার বিষয়টি আগে থেকে জানা ছিল না, যার ফলে বিল সমন্বয়ে কিছু সমস্যা হয়েছে। এছাড়া একজন সদস্য তার হিসাব জমা না দেওয়ায় সম্মিলিত বাজেটের খতিয়ান জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে, রাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক মোছা. নার্গিস খাতুনের নামে সাত ধাপে মোট ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৬২৬ টাকা তোলা হয়েছে। যার মধ্যে ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ১২৬ টাকার বিল-ভাউচার এখনো জমা পড়েনি। নথিতে দেখা যায়, রাকসু গেমস আয়োজনের জন্য দুই ধাপে ১২ লাখ ৭২ হাজার ৩৪০ টাকা এবং মে মাসে আয়োজিত অন্য একটি ইভেন্টের জন্য দুই ধাপে ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৮৬ টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয়েছিল। যদিও গত মাসে শুরু হওয়া রাকসু গেমসের ছয়টি ইভেন্ট এখনো চলমান। তবে বিল-ভাউচার জমা না দেওয়ার বিষয়ে নার্গিস খাতুন বলেন, ‘বিলগুলো তৈরি আছে, খুব শীঘ্রই তা জমা দিয়ে দেব।’

তহবিলের অনিয়ম কেবল সাধারণ সম্পাদক বা ক্রীড়া সম্পাদকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদের নামে ছয় ধাপে ১৩ লাখ ৪০ হাজার ৩২৪ টাকা উত্তোলন করা হলেও তার বিপরীতে জমা দেওয়া হয়েছে মাত্র ৯৯ হাজার ৯২৪ টাকার ভাউচার। বাকি ১২ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ টাকার কোনো হিসাব নেই। এই প্রসঙ্গে জাহিদ জানান, দ্রুত বিল-ভাউচার জমা দেওয়া উচিত, তবে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এবং অডিট সম্পন্ন হওয়ার আগেই তিনি সমস্ত হিসাব জমা দেবেন।

এছাড়া অন্যান্য সম্পাদকদের হিসেবেও দেখা গেছে বড় ধরনের ঘাটতি। বিতর্ক ও সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক ইমরান লস্কর ছয় ধাপে ৮ লাখ ৪২ হাজার ৭৬৫ টাকা তুলেছেন, যার মধ্যে অধিকাংশের হিসাব অসম্পূর্ণ। সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক জাহিদ হোসেন জোহার তিন ধাপে সাত লাখ ৯৫ হাজার টাকা নিলেও একটি কর্মসূচির চার লাখ ৬৫ হাজার টাকার হিসাব দেননি। তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বিএম নাজমুল সাকিবের নামে তিন ধাপে তিন লাখ ৯৬ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. মুজাহিদ ইসলামের নেওয়া এক লাখ ৫৪ হাজার ৪৪৮ টাকার মধ্যে এক লাখ টাকার ভাউচার জমা হয়নি। মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সায়িদা হাফসার নেওয়া এক লাখ ৮৮ হাজার ২৭৬ টাকার মধ্যে নারী উদ্যোক্তা মেলা বাবদ এক লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার হিসাব নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ তোফা নেপালে শিক্ষাবিষয়ক সেমিনারে অংশগ্রহণ বাবদ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকার হিসাব জমা দেননি। এছাড়া পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদের সেমিনারের জন্য নেওয়া ৮২ হাজার টাকা এবং এজিএস এসএম সালমান সাব্বিরের দাপ্তরিক খরচের ৬০ হাজার টাকার হিসাবও জমা পড়েনি। এমনকি কম্পিউটার প্রিন্টার কেনার জন্য অন্য এক নেতার নেওয়া ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫০ টাকার হিসাবও এখনো রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ।

রাকসুর কোষাধ্যক্ষ সেতাউর রহমান এই পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরপরই বিল-ভাউচার জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। অনেক ক্ষেত্রে বিল জমা না পড়ায় সংশ্লিষ্টদের নিয়ম মেনে দ্রুত হিসাব জমা দিতে বলা হয়েছে।

তহবিলের এই অপচয় ও অস্বচ্ছতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, রাকসুর তহবিলের অর্থ সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাঁদা থেকে আসে, তাই এই অর্থ কোনোভাবেই রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হতে পারে না। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল দাবি করেন, পুরো বিষয়টির উচ্চপর্যায় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ছাত্র অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আল শাহরিয়ার বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা অপরিহার্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম এই বিষয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিল-ভাউচার জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। রাকসুকেও এই নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। প্রতিটি সভায় হিসাবের স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।