সাবেক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ বিবেচনায় প্রাপ্ত প্লটগুলো এখন সরকারের নিবিড় পর্যবেক্ষণে। এরই ধারাবাহিকতায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও গাজীপুর-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য তানজিম আহমদ সোহেল তাজের নামে বরাদ্দকৃত একটি মূল্যবান প্লট বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ইতিমধ্যে এই বরাদ্দের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট শর্তাবলি যথাযথভাবে পালন করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত পর্যালোচনা শুরু করেছে। সংস্থাটি এই লক্ষ্যেই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং প্রাথমিক তদন্তে বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় নানা গুরুতর অসংগতি পরিলক্ষিত হয়েছে।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংসদ সদস্য হিসেবে বিশেষ কোটায় প্লট বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় শুরুতেই রয়েছেন সোহেল তাজ। সংগৃহীত তথ্যের যাচাই-বাছাই শেষে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে এই প্লটটি বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে এই প্রস্তাবটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।

রাজউকের সংরক্ষিত নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১১ সালে বিশেষ কোটার আওতায় রাজউকের উত্তরা (তৃতীয় পর্ব) আবাসিক এলাকায় পাঁচ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ পান সোহেল তাজ। ওই বছর অনুষ্ঠিত রাজউকের ষষ্ঠ বোর্ড সভায় উত্তরা আবাসিক এলাকার ১৬ নম্বর সেক্টরের ই-ব্লকের ১/এ নম্বর সড়কের ১ নম্বর প্লটটি তার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকারি নথিতে এই প্লটটির নির্দিষ্ট আইডি নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে ১৬/ই-০১/এ-০০১। বরাদ্দসংক্রান্ত দলিলে সোহেল তাজের জন্মতারিখ ৫ জানুয়ারি ১৯৭০ এবং পিতার নাম হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজউক কর্মকর্তারা ব্যাখ্যা করে জানান, ঢাকা টাউন ইমপ্রুভমেন্ট (অ্যালটমেন্ট অব ল্যান্ডস) রুলস, ১৯৬৯-এর ১৩(এ) ধারায় বিশেষ বিবেচনায় প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে। এই বিশেষ ধারার আওতায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অথবা গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বিশেষ কোটায় প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিতে পারতেন। এই প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়েই সোহেল তাজ উক্ত প্লটটি লাভ করেন। বরাদ্দের নথিতে তার বর্তমান ঠিকানা হিসেবে বাড়ি নম্বর ১৮/এ, রোড নম্বর ৩, পুরাতন ডিওএইচএস, ঢাকা এবং স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে গ্রাম-দরদরিয়া, ডাকঘর-ভুলেশ্বর, উপজেলা-কাপাসিয়া, জেলা-গাজীপুর উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজউকের নথি অনুযায়ী, সংসদ সদস্য ক্যাটাগরিতে এই পাঁচ কাঠার প্লটটি বরাদ্দ পাওয়ার পর সোহেল তাজ রাজউকের কোষাগারে কাঠাপ্রতি ৬ লাখ টাকা হিসেবে মোট ৩০ লাখ টাকা জমা দেন। এরপর যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্লটটি তার কাছে হস্তান্তর করা হয়। হস্তান্তরকৃত দলিলের নম্বর ৯৩২১ এবং হস্তান্তরের তারিখ ছিল ৩০ জুলাই ২০১২। তবে বরাদ্দ পাওয়ার খুব বেশিদিন পর তিনি প্লটটি নিজের দখলে রাখেননি। ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি এই প্লটটি তাসফিয়া কলিম ও লামিমা কলিম নামে দুই ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন। রাজউক কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে ধারণা করা হচ্ছে, তৎকালীন বাজারমূল্য অনুযায়ী ৫ কাঠার এই প্লটটি কমপক্ষে ৬ থেকে ৭ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল।

বর্তমানে প্লটটির অবস্থা খতিয়ে দেখতে গিয়ে দেখা গেছে, সোহেল তাজের নামে বরাদ্দ দেওয়া ওই জমিতে কোনো স্থাপনা নেই। আশপাশের বেশ কয়েকটি প্লটে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চললেও এই নির্দিষ্ট প্লটটি বর্তমানে সম্পূর্ণ খালি পড়ে আছে। সেখানে কোনো নামফলক বা মালিকানা নির্দেশক চিহ্নও চোখে পড়েনি।

রাজউক কর্মকর্তারা আরও জানান, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলেই ১৩(এ) ধারার অধীনে বিশেষ কোটায় প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই ধারায় যাদের নামে প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো আইন ও বরাদ্দের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা বর্তমানে কঠোরভাবে যাচাই করছে রাজউক। এই বিষয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই প্লট বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে রাজউক এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়।

এই স্পর্শকাতর বিষয়ে গত ৯ আগস্ট দুপুরে সাবেক সংসদ সদস্য সোহেল তাজের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তবে প্লটের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সাথে সাথে ফোনটি কেটে দেন। পরবর্তীতে তাকে পুনরায় কল করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।

রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘এই পুরো বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্লটগুলোর তালিকা বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছে। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের। এই প্রক্রিয়ায় রাজউকের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই, আমরা কেবল তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছি।’