সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা ডায়াবেটিক হাসপাতালে কোটি টাকার প্রতারণা: পরিচালক মিলনের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের তীব্র বিক্ষোভ ও অবরুদ্ধ কর্মসূচি
হাফিজুর রহমান, কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধিঃ
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত নলতা ডায়াবেটিক এন্ড জেনারেল হাসপাতালে একটি সুপরিকল্পিত প্রতারক চক্রের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ফ্রি চিকিৎসা সুবিধা এবং ৬ বছরে আমানত দ্বিগুণ করার প্রলোভন দেখিয়ে হাজার হাজার সাধারণ গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করে তা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের পরিচালক মিলন হোসেনের বিরুদ্ধে। বছরের পর বছর তাদের জমানো টাকা ফেরত না পেয়ে এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী লভ্যাংশ না পেয়ে চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েন ভুক্তভোগীরা। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি হাসপাতালের সামনে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ এবং পরিচালকের কক্ষ অবরুদ্ধ করে রাখার কর্মসূচি পালন করেন তারা।
গত সোমবার, ১০ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা ডায়াবেটিক এন্ড জেনারেল হাসপাতালের সামনে শত শত নারী-পুরুষ গ্রাহক একত্রিত হয়ে এই বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের জমা রাখা আমানত ও লভ্যাংশ পরিশোধ করা হয়নি। বারবার সময় নেওয়া সত্ত্বেও টাকা ফেরত দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন নলতা ডায়াবেটিক এন্ড জেনারেল হাসপাতাল এবং নলতা ডায়াবেটিস হাসপাতাল কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেডের পরিচালক মিলন হোসেন।
বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি চলাকালীন সময়ে পরিচালক মিলন হোসেন উপস্থিত সাংবাদিকদের মাধ্যমে একটি সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তার এই প্রস্তাব গ্রাহকদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয় এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে অবস্থা বেগতিক দেখে পরিচালক মিলন হোসেন তার অফিস কক্ষে আশ্রয় নিলে, সেখানে উপস্থিত মাঠকর্মী এবং বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা টাকা ফেরতের দাবিতে তাকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি চলতে থাকে। এই সময় পরিচালক পক্ষ থেকে প্রতি মাসে মাঠকর্মীদের মাধ্যমে গ্রাহকদের ত্রিশ হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, গ্রাহক ও মাঠকর্মীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং পুরো টাকা অবিলম্বে ফেরত পাওয়ার দাবিতে অনড় থাকেন।
মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন মাঠকর্মী চম্পা সরকার, আমেনা খাতুন, ফিরোজা বেগম, আবেদার আলী খান, আশরাফ হোসেন এবং প্রভাতী রানী প্রমূখ। সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন যে, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে 'নলতা ডায়াবেটিক হাসপাতাল কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেড' নামে একটি সমিতি গঠন করা হয়। এরপর ছয় বছরে টাকা দ্বিগুণ করার লোভ দেখিয়ে এবং মোটা অংকের লাভের প্রলোভন দিয়ে মাঠকর্মীদের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে চার হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে তিন কোটি টাকারও বেশি আমানত সংগ্রহ করা হয়।
ভুক্তভোগীদের করুণ আর্তনাদ ফুটে ওঠে সমাবেশে। বক্তারা বলেন, আমানতের টাকা ফেরত না পাওয়ায় অনেক গ্রাহক চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কেউ কেউ অনাহার ও অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু পথযাত্রী হয়েও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এক টাকাও সহায়তা পাননি। গত তিন মাস আগে এই প্রতারণার বিষয়ে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নিকট লিখিত অভিযোগ জানালেও, এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। এমনকি উপজেলা সমবায় কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানালেও তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ করেন গ্রাহকরা। তাদের অভিযোগ, কর্মকর্তাটি তার অফিসের এসিতে বসে ঠান্ডা হয়ে থাকলেও ভুক্তভোগী গ্রাহকরা এখন তীব্র অর্থসংকটের আগুনে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছেন।
বিক্ষুব্ধ মাঠকর্মী চম্পা সরকার, আমেনা খাতুন ও ফিরোজা বেগমসহ অনেকে বলেন, "গ্রাহকরা আমাদের বিশ্বাস করে, আমাদের কথা শুনে টাকা জমা দিয়েছেন। এখন তারা কোনো পরিচালককে চিনতে চান না। সময়-অসময়ে গ্রাহকরা আমাদের বাড়িতে এসে হামলা করছেন এবং লাঞ্ছিত করে টাকা আদায়ের চেষ্টা করছেন। কিন্তু এসব সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের টন নড়েনি।"
ভুক্তভোগীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের পাওনা টাকা ফেরত দেওয়া না হলে তারা আরও বড় ধরনের কর্মসূচি পালন করবেন। অন্যদিকে, এই পুরো বিষয় নিয়ে হাসপাতালের পরিচালক মিলন হোসেন প্রতিনিধিকে জানান, তিনি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবসা করে গ্রাহকদের টাকা শোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু গ্রাহকরা তা মানছেন না। এই সংকটময় পরিস্থিতি নিরসনে তিনি প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।







