ফুটপাতে পাঠশালা: দারিদ্র্যের কষাঘাত ছাপিয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন প্রিয়জিতের

মানিকগঞ্জ চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরের ব্যস্ত ফুটপাত। চারপাশে মানুষের ভিড়, যাতায়াতের কোলাহল আর আদালতের নিত্যদিনের ব্যস্ততা। এই ব্যস্ততার মাঝেই এক কোণে খোলা আকাশের নিচে বসে জুতা সেলাই করেন সাগর রবিদাস। কিন্তু এই কর্মব্যস্ত পরিবেশের মাঝে এক অদ্ভুত ও অনুপ্রেরণাদায়ক দৃশ্য চোখে পড়ে। বাবার কাজের পাশেই ছোট একটি জায়গায় বই খুলে একমনে পড়াশোনা করে তার ছোট্ট ছেলে প্রিয়জিত রবিদাস। চরম দারিদ্র্য আর অভাবের কষাঘাত চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে এই পরিবারটিকে, কিন্তু এই শিশুমনের স্বপ্ন আকাশছোঁয়া— সে বড় হয়ে একদিন ডাক্তার হবে।

দারিদ্র্যের কষাঘাতে ফুটপাতই এখন প্রিয়জিতের পাঠশালা। মানিকগঞ্জ পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম দাশড়া এলাকার বাসিন্দা প্রিয়জিত স্থানীয় ৮৮ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্লে শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা সাগর রবিদাস পেশায় একজন চর্মকার। দীর্ঘ বছর ধরে তিনি আদালত চত্বরে জুতা সেলাই ও কালি করার কাজ করে অতি কষ্টে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করছেন। সাগর রবিদাস নিজে কোনোদিন স্কুলের মুখ দেখেননি, কিন্তু সন্তানদের শিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তার মনে। তিনি বিশ্বাস করেন, শিক্ষার আলোই পারে তাদের এই অন্ধকার জীবন থেকে মুক্তি দিতে।

অভাবের তাড়নায় প্রিয়জিতকে কোনো প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পাঠানো কিংবা কোচিং সেন্টারে দেওয়ার সামর্থ্য এই পরিবারের নেই। ফলে প্রতিদিন স্কুল ছুটি হলেই প্রিয়জিত সোজা চলে আসে বাবার কর্মস্থলে। ফুটপাতে বসে বাবা যখন ছেঁড়া জুতা সেলাইয়ের কঠিন শ্রমে ব্যস্ত থাকেন, তখন তার পাশেই বসে বইয়ে মুখ গুঁজে দেয় প্রিয়জিত। বাবাও তার হাতের কাজের ফাঁকে ফাঁকে সাধ্যমতো ছেলেকে পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। বাবার এই সামান্য সহযোগিতা আর ছেলের অদম্য আগ্রহই তাদের শিক্ষার প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষার এই আলো কেবল প্রিয়জিতের জীবনেই আসেনি, তার ছোট বোন রাখি রাণী রবিদাস দিয়াও পড়াশোনায় দারুণ আগ্রহী। স্থানীয় শাহীন স্কুলের প্লে শ্রেণির শিক্ষার্থী দিয়াও প্রায়ই বাবার কর্মস্থলে চলে আসে। খোলা আকাশের নিচে, ধুলোবালি আর কোলাহলের মাঝে ভাইবোন মিলে চালিয়ে যায় তাদের পড়ালেখার চর্চা। চার সদস্যের এই পরিবারটিতে সামান্য আয়ে সংসার চালানো প্রতিদিনের এক কঠিন সংগ্রাম। সেখানে সন্তানদের বই-খাতা ও পড়াশোনার খরচ জোগানো হয়ে দাঁড়িয়েছে এক বড় অনিশ্চয়তার নাম। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে তাদের এই কষ্ট আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। তবুও হাজারো প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করে সন্তানদের মুখে হাসির ঝিলিক দেখতে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন বাবা-মা।

নিজের জীবনের অপূর্ণতার কথা জানিয়ে জুতা সেলাইয়ের কারিগর সাগর রবিদাস আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, তিনি এবং তার স্ত্রী শিল্পী রবিদাস— উভয়েই অশিক্ষিত। তারা চান তাদের সন্তানরা যেন তাদের মতো অশিক্ষিত না থাকে এবং সমাজের মূলধারায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে হলেও ছেলে স্কুল শেষে তার কাছেই চলে আসে এবং দোকানের পাশেই বসে পড়াশোনা করে। প্রিয়জিতের মা শিল্পী রবিদাস আকুতি জানিয়ে বলেন, তারা অভাবের সাথে লড়াই করে হলেও সন্তানদের মানুষ করতে চান। আর ছোট্ট প্রিয়জিতের কাছে তার লক্ষ্যের কথা জানতে চাইলে সে দৃপ্ত কণ্ঠে জানায়, সে বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায় এবং আর্তমানবতার সেবা করতে চায়।

শিশু বিকাশ ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিকূল ও বৈরী পরিবেশের মধ্যেও শিশুদের পড়াশোনার এই অদম্য কৌতূহল তাদের অভ্যন্তরীণ মেধার বড় প্রমাণ। তবে খোলা আকাশের নিচে ফুটপাতের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এবং ধুলোবালিযুক্ত পরিবেশে দীর্ঘ সময় বসে পড়ালেখা করা শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্য ও চোখের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রিয়জিতের মতো সুবিধাবঞ্চিত ও মেধাবী শিশুদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উপবৃত্তি, বিনামূল্যে টিউটরিং এবং তাদের পরিবারের জন্য উপযুক্ত সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন, সচ্ছল সমাজসেবক এবং বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা যদি এই পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, তবে এমন মেধাবী শিশুদের ঝরে পড়া রোধ করা সম্ভব হবে এবং তাদের স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন ঘটবে।