রূপালি ইলিশের আকাল: বরগুনার উপকূলীয় জেলেদের জীবন এখন চরম সংকটে
প্রতিবছর বর্ষার এই সময়ে বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় নদ-নদীতে রূপালি ইলিশের প্রাচুর্যে মুখর থাকার কথা ছিল গোটা বরগুনা অঞ্চল। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই পরিচিত চিত্র যেন সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। ভরা মৌসুমেও জেলেদের জালে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত রূপালি ইলিশ। গভীর সাগরে দিনের পর দিন অবস্থান করেও অধিকাংশ ট্রলার ফিরছে প্রায় খালি হাতে। ফলে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজার হাজার জেলে পরিবার।
ঋণের জাঁতাকলে পিষ্ট উপকূলের জীবন: বরগুনার আমতলী, তালতলী, বেতাগী, বামনা, পাথরঘাটা ও সদর উপজেলার বিশাল এক জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। তবে বর্তমানে পর্যাপ্ত মাছের অভাব, দফায় দফায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা, বৈরী আবহাওয়া, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, জলদস্যুর আতঙ্ক এবং ব্যাংক ও এনজিওর ঋণের কিস্তির প্রবল চাপ—সব মিলিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়েছে পুরো উপকূল।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ট্রলারের আকার ও সমুদ্রযাত্রার সময়ভেদে জ্বালানি তেল, বরফ, রশদ (খাবার) ও শ্রমিকের মজুরিসহ মোট ১ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু সাগরে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় এই মূল খরচটুকুও উঠছে না। একের পর এক লোকসান গুনে ট্রলার মালিক ও জেলেরা এখন দিশেহারা হয়ে ব্যাংক, এনজিও ও মহাজনদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কিস্তির টাকা মেটাতে অনেকেই নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ শোধ করার এক অন্তহীন বিষচক্রে জড়িয়ে পড়ছেন।
উপকূলের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে এক করুণ দৃশ্য। আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় অধিকাংশ পরিবারে এখন ঠিকমতো চুলা জ্বলছে না। ক্ষুধার তাড়নায় অনেকে গবাদিপশু বিক্রি কিংবা ঘরের মূল্যবান আসবাবপত্র বন্ধক রেখে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন। বিকল্প কোনো কাজের সুযোগ না থাকায় সমুদ্রই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা, আর সেখানে মাছ না মিললে জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
ধস নেমেছে মৎস্যনির্ভর অর্থনীতিতে: মাছের অভাবের প্রভাব পড়েছে আড়তগুলোতেও। বাজারে সরবরাহ কম থাকায় ইলিশের দাম এখন চড়া। ফলে পর্যাপ্ত মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন সাধারণ ক্রেতারা। আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা জানান—জেলে, ব্যবসায়ী, আড়ত শ্রমিক, বরফকল ও পরিবহন শ্রমিকসহ মৎস্য খাতের পুরো অর্থনীতি এখন ভয়াবহ ক্ষতির মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীর নাব্যতা সংকট, ডুবোচর সৃষ্টি, সমুদ্রের পরিবেশগত পরিবর্তন এবং অবৈধ কারেন্ট ও ছোট ফাঁসের জালের অবাধ ব্যবহারের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ পথ ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি জেলেদের: জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বরগুনায় প্রায় ৪৮ হাজার ৬০০ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। তবে এর বাইরে আরও কয়েক হাজার অনিবন্ধিত জেলে রয়ে গেছেন, যারা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত। প্রজনন ও অবরোধকালীন সময়ে নিবন্ধিত জেলেরা যে খাদ্য সহায়তা পান, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে সংসার চালানো অসম্ভব বলে তাদের অভিযোগ।
উপকূলের জেলেদের দাবি—সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, জ্বালানি তেলে ভর্তুকি, অনিবন্ধিত জেলেদের অতিদ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনা, সমুদ্র দস্যুতা দমন, দুর্যোগকালীন বিশেষ সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে। স্থানীয় জেলেদের আকুতি এখন একটাই—"সাগরে মাছ নেই, ঘরে খাবার নেই, অথচ ঋণের কিস্তি থেমে নেই।"









