সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দুপুর ১২টায় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠেয় এই বৈঠকে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রস্তাব এবং সংশোধনের সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত প্রাথমিক আলোচনা হবে। একই সঙ্গে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, কমিটির সদস্যদের কাছে ইতোমধ্যে বৈঠকের আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠানো হয়েছে। বৈঠকে মূলত সংবিধানের যেসব অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে সুপারিশ এসেছে, সেগুলো নিয়ে গভীর মতবিনিময় হবে। এ ছাড়া কমিটির কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে। আজকের এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ।
সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি এখন নতুন ও বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। বিশেষ করে নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা, রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ব্যাপক সংস্কারের দাবি উঠেছে। বিশেষ কমিটি এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা করবে। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় প্রশ্ন উঠেছে—বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা এই প্রক্রিয়ায় অংশ না নিলে আলোচনা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গ্রহণযোগ্য হবে। বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধানের মতো রাষ্ট্রের মৌলিক দলিলে পরিবর্তন আনতে হলে সর্বদলীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য, যা সংশোধন প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার দুই দিন আগে, গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১৭ সদস্যের এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। তবে বিরোধী দলের পাঁচ সদস্যের নাম পাওয়া না যাওয়ায় আপাতত ১২ সদস্য নিয়েই কমিটি কার্যক্রম শুরু করেছে। এই কমিটিতে সরকারি দলের পাশাপাশি কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বিরোধী জোটের জন্য নির্ধারিত আসনগুলো এখনো শূন্য রয়ে গেছে। কমিটি গঠনের এই প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। তবে তৎকালীন সময়ে সংসদে জানানো হয়, বিরোধী দল চাইলে যেকোনো সময় এই কমিটিতে যোগ দিতে পারবে। বর্তমানে কমিটিকে আরও কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক করতে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পর এ পর্যন্ত মোট ১৭ বার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের এক জোরালো দাবি সামনে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচনব্যবস্থা এবং জনপ্রশাসনসহ মোট ১১টি খাতের সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও সংলাপের পর ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ গৃহীত হয়। পরবর্তীতে নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন, যার ওপর ভিত্তি করে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ওই আদেশের অধীনে সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল। তবে এখানে রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে; জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের ৭৭ জন সদস্য উভয় শপথ গ্রহণ করলেও সরকারি দল বিএনপি জোটের এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।










