চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়কদের আশ্রয় এবং সেই প্রক্রিয়ার পেছনে তথাকথিত 'আমেরিকান ষড়যন্ত্রতত্ত্ব' নিয়ে কলামিস্ট ও সমাজ চিন্তক ফরহাদ মজহারের করা বিস্ফোরক দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সভাপতি রিফাত রশিদ। রোববার (০৯ আগস্ট) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক বিস্তারিত পোস্টে তিনি এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং ফরহাদ মজহারের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান।

ঘটনার সূত্রপাত একটি অনলাইন গণমাধ্যমের পডকাস্ট থেকে, যেখানে ফরহাদ মজহার দাবি করেন যে, জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়ে আন্দোলনের সমন্বয়কদের বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু বিদেশি দূতাবাস আন্দোলনকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বিশেষ 'সেফ হাউস' পরিচালনা করেছিল। তার দাবি অনুযায়ী, প্রাণ বাঁচাতে কিছু সমন্বয়ক এসব দূতাবাসের সহায়তা চেয়েছিলেন এবং ওই সেফ হাউসগুলোতে তাদের পরিকল্পিতভাবে 'মগজধলাই' করা হয়েছে। ফরহাদ মজহারের মতে, মার্কিন দূতাবাসের প্রভাবে বা তাদের নির্দেশনায় সমন্বয়কদের শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি জানাতে উৎসাহিত করা হয়েছিল।

এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রিফাত রশিদ তার পোস্টে অত্যন্ত কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, ফরহাদ মজহারের দাবি করা সেই 'সেফ হাউসগুলো' যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি লেখেন, ‘ফরহাদ ভাই আজ দুই বছর পর দাবি করে বসলেন, সেফ হাউসগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে চলেছে। আমি জানি না, তার সোর্স কী, তিনি কোথা থেকে এগুলো শুনে এসেছেন বা কারা তাকে বলেছে। যারাই বলুক, তারা অসৎ উদ্দেশ্যে বলেছে।’

রিফাত রশিদ ফরহাদ মজহারের পেশাদারিত্বের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ফরহাদ মজহার যেহেতু তাদের সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তাই একটি সাধারণ ফোন কলের মাধ্যমে তথ্যের সত্যতা যাচাই (ক্রসচেক) করে নিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি গণমাধ্যমে এমন কিছু কথা বলেছেন যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

আন্দোলনের সেই সংকটময় সময়ে তারা কোথায় এবং কীভাবে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রদান করেন রিফাত রশিদ। তিনি জানান, তিনি, হান্নান মাসুদ ও মাহিন সরকার উত্তরার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল থেকে তৎকালীন সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার তাড়া খেয়ে এক রাতের জন্য একটি মানবাধিকার সংস্থার কার্যালয়ে আশ্রয় নেন, যার ব্যবস্থা করেছিলেন মুনতাসীর রহমান। এরপর তারা আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের এক বন্ধুর পরিচালিত একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখান থেকে তারা পাঠাওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম-আন্দালিব দম্পতির বাসভবনে যান। পরবর্তীতে মানবাধিকারকর্মী লেলিন তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নেন।

রিফাত রশিদ আরও জানান, শুরুতে তাদের সদরঘাটের কাছাকাছি একটি গেস্টহাউসে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত লেলিন তাদের তৎকালীন বিএনপি নেতা ওয়াহিদ আলমের ডিওএইচএস কার্যালয়ে নিয়ে যান। এই যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন জুলকারনাইন সায়ের। এরপর ৩ আগস্ট বিকেলে তারা শেরপুর-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরীর বাসভবনে যান এবং সেখান থেকে তিনি ও মাহিন সরকার মোহামিন পাটোয়ারীর বাসায় আশ্রয় নেন।

আন্দোলনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা আব্দুল কাদেরের আশ্রয়ের বিষয়ে কথা বলে রিফাত রশিদ জানান, কাদের প্রথমে শিবিরের ব্যবস্থাপনায় একটি আশ্রয়ে ছিলেন এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ কার্যালয়ের কর্মকর্তা তাইসিরের বাসভবনে যান।

পুরো ঘটনার বিবরণ দেওয়ার পর রিফাত রশিদ ফরহাদ মজহারের কাছে প্রশ্ন করেন, ‘এই হলো আমাদের পুরো সময়ের সেফ হাউসের বিস্তারিত। এখন ফরহাদ ভাইয়ের কাছে আমার প্রশ্ন হলো, এখানে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের তৈরি করা সেফ হাউস কোনটি? আমরা তো সবার বাসাবাড়িতে থেকেছি, স্কুল বন্ধ থাকায় সেখানে থেকেছি, নয়তো কারও ব্যক্তিগত অফিসে থেকেছি।’ তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন, যারা তাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাদের কেউ কোনো রাজনৈতিক পরামর্শ দিতে আসেননি। তবে ২ আগস্ট রাতে এক দফা দাবি নিয়ে তাদের কাছে কেউ পরামর্শ দিতে এসেছিলেন, কিন্তু তারা সেই পরামর্শ গ্রহণ করেননি বলে জানান তিনি।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, রিফাত রশিদ জানান, ২ আগস্ট রাতে এক দফার ঘোষণার ভাষা বা লাইন কেমন হতে পারে, সেই বিষয়ে পরামর্শ নেওয়ার জন্য তিনি নিজেই ফরহাদ মজহারকে ফোন করেছিলেন এবং তার বেশ কিছু পরামর্শ নোটও করেছিলেন। এই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যার কাছে পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল, তিনিই এখন পুরো প্রক্রিয়াটিকে আওয়ামী লীগের বয়ানের মতো 'আমেরিকান ষড়যন্ত্রতত্ত্বের' আওতায় নিয়ে যাচ্ছেন, যা অত্যন্ত সমস্যাজনক। রিফাত রশিদের দাবি, এই ধরনের বয়ানের কারণে ফরহাদ মজহার এখন আওয়ামী লীগের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছেন।

তীব্র সমালোচনা করলেও ফরহাদ মজহারের প্রতি শ্রদ্ধার কথা ব্যক্ত করেন রিফাত রশিদ। তিনি বলেন, ফরহাদ মজহারের চিন্তা, লড়াই এবং আদর্শের প্রতি তার অটল থাকার দৃঢ়চেতা মনোভাব অনেক তরুণকে আকর্ষণ করেছে এবং অনেকে তার কাছে জ্ঞান অর্জনের জন্য গিয়েছে। এমনকি ফরহাদ মজহারের ‘ভাববৈঠকী’র মাধ্যমে তারা সিভিল সোসাইটির একটি বড় নেটওয়ার্কের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছেন, যা মুনতাসীর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সহায়ক হয়েছিল।

পোস্টের শেষ পর্যায়ে রিফাত রশিদ ফরহাদ মজহারের কাছে একটি সরাসরি প্রশ্ন রাখেন। তিনি জানতে চান, ফরহাদ মজহার এত বছর ধরে যে কমিউনিটি গড়ে তুলেছেন, তাকেই কি তিনি এখন 'আমেরিকান মদদপুষ্ট গোষ্ঠী' বলে অভিহিত করবেন? রিফাত রশিদ বলেন, যদি তা হয়, তবে তারা নিজেদের প্রতারিত মনে করবেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ফরহাদ মজহার তার উত্থাপিত এই প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর দেবেন।