অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পরিকল্পিতভাবে বিএনপির সঙ্গে চাঁদাবাজির একটি নেতিবাচক ‘বয়ান’ বা ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

চাঁদাবাজির সঙ্গে বিএনপির নাম জড়ানোর প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিএনপির সঙ্গে চাঁদাবাজির এক ধরনের ট্যাগিং করার চেষ্টা আসলে পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিনি এটিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে অভিহিত করেন। উপদেষ্টা স্পষ্ট করে জানান, বর্তমান সরকারের সময়ে বা সরকারি দলের কারও প্ররোচনায় এই ধরনের কাজ হচ্ছে না। তিনি বলেন, “আমরা এখানে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভের কথা বলছি। এই চেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই আসলে শুরু হয়েছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। এটি রাজনীতিরই একটি অংশ এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা এই ধরনের রাজনীতি করার চেষ্টা করতেই পারেন।”

অন্যদিকে, জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের প্রসঙ্গ তুলে জাহেদ উর রহমান বলেন, এই অর্তকিত হামলার শিকার হওয়ায় সালমানের প্রতি সরকারের গভীর সহানুভূতি রয়েছে। তবে ঘটনার পরপরই চাঁদাবাজি এবং বিএনপির সংশ্লিষ্টতার যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছিল, পরবর্তীতে সেই বক্তব্যের কিছু অংশ পরিবর্তিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, সালমান মুক্তাদির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তার প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যাপক অনুসারী থাকা কোনো জনপ্রিয় ব্যক্তি যখন অভিযোগ করেন, তখন তার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি হয়, যা জনমনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

তথ্য উপদেষ্টা আরও জানান, পরবর্তী সময়ে সালমান নিজেই তার কাছে চাঁদা চাওয়ার বিষয়ে দেওয়া আগের বক্তব্য সংশোধন করেছেন। ফলে প্রাথমিক বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে যেসব রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং প্রচার চালানো হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল।

ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমিরসহ বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও আলোচনা করেন তিনি। জাহেদ উর রহমান বলেন, সালমানের প্রাথমিক বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে জামায়াতের আমির সরকার ও সরকারি দলকে দায়ী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে নতুন তথ্য সামনে এলেও সেই পোস্টটি প্রত্যাহার বা সংশোধন করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্যমতে, প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে কেউ প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন, তবে পরে সেই তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ বলে প্রতীয়মান হলে নিজের অবস্থান সংশোধন করাও একটি দায়িত্বশীল আচরণের অংশ।

এনসিপির কয়েকজন নেতার বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তথ্য উপদেষ্টা অভিযোগ করেন, ঘটনার পর বিএনপি, দলটির নেতৃত্ব এবং বর্তমান সরকারকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নতুন তথ্য সামনে এলেও সেসব বক্তব্যের অনেকগুলোর সংশোধন করা হয়নি। জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার ক্ষমতায় থাকলে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে যৌক্তিক সমালোচনার অনেক ক্ষেত্র থাকে, যার জন্য অপতথ্যের আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

তবে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাকে সরকার হালকাভাবে দেখছে না বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, কোনো নাগরিকের প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর বা তার ওপর হামলা হলে তা ঠেকানো রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। এমন ঘটনা ঘটলে সরকার বিব্রত ও দুঃখিত হয়। হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পাশাপাশি নেপথ্যে থাকা মূল পরিকল্পনাকারীদেরও তদন্তের আওতায় আনার কথা জানান তথ্য উপদেষ্টা। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, তদন্তে যদি ক্ষমতাসীন দলের কোনো ব্যক্তি, পুলিশ সদস্য বা অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তবে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। দলীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও যোগ করেন, সরাসরি ভাঙচুরে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করাই তদন্তের শেষ লক্ষ্য নয়, বরং এর পেছনে অন্য কারও হাত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সবশেষে এনসিপির চাঁদাবাজবিরোধী কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এনসিপির যে কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে, তা তাঁর কাছে একটি ‘স্যাটায়ার’ বা ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ মনে হয়েছে এবং তারা তা করতেই পারেন। তিনি বলেন, যেকোনো সহিংস কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে এই ধরনের কর্মসূচিকে সরকার স্বাগত জানায়। এনসিপি যদি মনে করে এর মাধ্যমে তারা জনগণের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে, তবে তারা তাদের নিজস্ব জায়গা থেকে সেই চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে।