উজ্জ্বল রায়
নড়াইল জেলার মুলিয়া উপজেলার এক প্রান্তিক জনপদে বাস করেন গোপী বিশ্বাস। জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী এই মানুষটির জীবন যেন এক নিরন্তর সংগ্রামের দীর্ঘ উপাখ্যান। জন্ম থেকেই একটি পা অচল গোপীর কাছে তার এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা যেন এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলার ক্ষমতা নেই তার, তাই জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হয় লাঠির ভর দিয়ে। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে মানসিকভাবে দমাতে পারেনি; বরং ছোটবেলা থেকেই তিনি চেষ্টা করেছেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে এবং আত্মনির্ভরশীল হতে। জীবনের숱 চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমানে ইলেকট্রনিক পণ্য মেরামতের কাজের মাধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।
এই মানবিক গল্পের বিস্তারিত জানিয়েছেন নড়াইল জেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল রায়। তিনি জানান, নড়াইল সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের কাজলা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত পানতিতা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা গোপী বিশ্বাস। বাবা নিতাই বিশ্বাস ও মা কল্পনা বিশ্বাসের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি সবার ছোট। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণে শৈশব থেকেই তার সামনে ছিল নানা বাধা। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলেও পারিবারিক চরম অভাবের কারণে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পরেই তাকে স্কুল ছাড়তে হয়। শিক্ষার সুযোগ না পেলেও জীবনযুদ্ধ জয় করার তাড়না ছিল প্রবল। তাই ছোটবেলায় এলাকারই এক দোকানে সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন গোপী। কঠোর পরিশ্রম আর আগ্রহের মাধ্যমে টর্চ লাইট, গ্যাস লাইটসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির মেরামতের কাজ রপ্ত করেন তিনি। দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে তিনি এই পেশার সাথে যুক্ত।
তবে এই দীর্ঘ পথচলা খুব একটা সহজ ছিল না। আয়ের স্বল্পতার কারণে অনেক সময় এই পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে মাঝে মাঝে ভ্যান চালানো, চা বিক্রি, এমনকি ওয়েল্ডিংয়ের কাজও করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সেই কাজগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি আবারও তার পরিচিত মেরামতের পেশায় ফিরে আসেন। বর্তমানে জেলা শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে মুলিয়া বাজারের দক্ষিণ পাশে, মুলিয়া-বাহিরগ্রাম সড়কের এক পাশে একটি অতি ক্ষুদ্র একচালা দোকান বসিয়েছেন তিনি। মাথার ওপর কেবল একটি টিনের ছাউনি, কিন্তু চারপাশের কোনো বেড়া নেই। রোদ, বৃষ্টি কিংবা ধুলোবালি উপেক্ষা করেই সেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বসে টর্চ লাইট, গ্যাস লাইট, এলইডি বাল্ব, স্প্রে মেশিন ও রাইস কুকারসহ নানা ইলেকট্রনিক সামগ্রী মেরামত করেন তিনি।
গোপীর কাঁধে এখন চার সদস্যের পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার। তার বড় মেয়েটি বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে প্রতিদিন তার আয় হয় মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। খুব ভালো দিন হলে কখনো ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। বর্তমান বাজারে নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের সাথে এই সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে যন্ত্রপাতির ব্যাগ নিয়ে এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে পাশের তুলারামপুর হাটেও যান তিনি, এই আশায় যে হয়তো সেখানে কিছু বাড়তি কাজ মিলবে।
নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে গোপী বিশ্বাস বলেন, ‘আজ একটু হলুদ কিনি, কাল একটু লবণ। ছেলেমেয়েদের মাছ খাওয়াতে পারি না। অনেক সময় দেনা করে বাজার করতে হয়। তিন মাস পর পর সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতার কিছু টাকা পাই, কিন্তু তা দিয়ে কোনো সংসার চলে না, সব টাকা দেনা শোধ করতেই চলে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবন্ধী জীবনটাই যেন আমার কাছে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে সংসার চালানো, অন্যদিকে ছেলেমেয়েদের মানুষ করা—এই দুশ্চিন্তায় আমি সারাদিন থাকি। সরকারের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, আমাদের মতো অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াক। আমাদের সন্তানরা যেন মানুষ হতে পারে, সেই ব্যবস্থা করে দিক। তারা মানুষ হতে পারলে আমার জীবনের এই কষ্টের কিছুটা সার্থকতা থাকবে।’
স্থানীয় বাসিন্দারাও গোপীর কাজের প্রশংসা করেন। তারা জানান, গোপীর মতো দক্ষ ও অভিজ্ঞ মেরামতকারীর ওপর এলাকার অনেকেই নির্ভরশীল। তিনি না থাকলে ছোটখাটো মেরামতের কাজেও শহরে যেতে হতো, যা সময় ও অর্থ উভয় দিক থেকেই ব্যয়বহুল। গোপীর দোকানে লাইট মেরামত করতে আসা মিলন সরকার বলেন, ‘গোপীর কাজের মান অত্যন্ত ভালো, তাই আমরা ইলেকট্রনিক জিনিস মেরামতের জন্য তার কাছেই আসি। তার কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগে, কিন্তু আমরা নিজেরাও খুব বেশি কিছু করতে পারি না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই খুপড়ি ঘরে বসে সে তার সংসার চালায়।’
একই কথা বলেন কোড়গ্রামের বাসিন্দা বিকাশ রায়। তিনি জানান, ‘গোপী দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারে কাজ করছে। সে একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ এবং তার কাজও প্রশংসনীয়। আমরা তার ওপর ভরসা করি। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কেউ যদি এই সংগ্রামী মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তবে হয়তো গোপীর মতো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনটা আরও সহজ হয়ে উঠবে।’
মুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, ‘গোপী বিশ্বাস একজন প্রতিবন্ধী হয়েও স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবনযুদ্ধ লড়ছেন। তার এই অদম্য লড়াই অন্যদের জন্য অনুকরণীয়। আমাদের এলাকায় অনেকে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করছেন, কিন্তু গোপী কারো কাছে হাত পাতেন না। ছোটবেলা থেকেই তিনি কাজ করে নিজের সম্মান ধরে রেখেছেন। তিনি ইতিমধ্যে প্রতিবন্ধী ভাতার সুবিধাভোগী হয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাকে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।’











