দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়েই প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে ‘প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে’—এমন বক্তব্য প্রদান এবং তা গণমাধ্যমে প্রচারের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। একই সঙ্গে, কোনো বিষয় যখন তদন্ত বা অনুসন্ধানাধীন থাকে, তখন সে বিষয়ে গণমাধ্যমে মানহানিকর বক্তব্য প্রদান বা প্রেস ব্রিফিং করা থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) বিরত রাখার জন্য আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে ওই রিটে।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আসিফ মাহমুদের পক্ষে এই রিট আবেদনটি দাখিল করেন তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মূসা। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে দায়ের করা এই রিটের নম্বর ১৩৮৮৫/২০২৬। রিট আবেদনে বিবাদী হিসেবে দুদকের চেয়ারম্যান, কমিশনের উপপরিচালক (জনসংযোগ কর্মকর্তা) এবং সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ কর্মকর্তা)-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, গত ২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে যে প্রেস ব্রিফিংগুলো করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত। তাই এই ব্রিফিংগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করার পাশাপাশি অনুসন্ধান বা বিচারাধীন কোনো বিষয়ে ভবিষ্যতে প্রেস ব্রিফিং থেকে বিরত থাকতে কমিশনকে নির্দেশনা দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। এছাড়া, ইতিপূর্বে প্রচারিত বিতর্কিত বক্তব্যের বিষয়ে সমগুরুত্ব দিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক প্রত্যাহার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে রিটে।

‘অনুসন্ধানের শুরুতেই প্রাথমিক সত্যতা কীভাবে পাওয়া সম্ভব’—রিট আবেদনে এই প্রশ্ন তুলে ধরে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২ সেপ্টেম্বর দুদকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির একজন উপপরিচালক জানান যে, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে বদলি, নিয়োগ এবং পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগে ‘প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায়’ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। আসিফ মাহমুদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের সুস্পষ্ট বিধান অনুযায়ী, কোনো অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা নিরূপণের বিষয়টি কেবল অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শেষ করার পরেই সম্ভব। অনুসন্ধান শুরু করার আগেই এ ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য দেওয়ার কোনো আইনগত এখতিয়ার দুদকের নেই।

রিটে আরও জানানো হয়, পরবর্তীতে ৯ সেপ্টেম্বর দুদকের সচিব গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে ওই বিতর্কিত বক্তব্যকে ‘স্লিপ অব দ্য টাং’ বা অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে অভিহিত করেন। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিষয়টি ভুল বলে স্বীকার করেন। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ওই বক্তব্যের কোনো আনুষ্ঠানিক ও স্পষ্ট প্রত্যাহার বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি, যার ফলে সাধারণ মানুষের মনে ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে বলে রিটে দাবি করা হয়েছে।

আইনি নোটিশ দেওয়ার পরও দুদকের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে রিটে। বলা হয়েছে, এ বিষয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর দুদককে আইনি নোটিশ পাঠানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। বরং তার তিন দিন পর, ১৩ সেপ্টেম্বর দুদকের এক সহকারী পরিচালক পুনরায় প্রেস ব্রিফিং করেন। ওই ব্রিফিংয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়ন, ওয়াসা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার এবং বিদেশে অর্থপাচারসহ আরও নানা গুরুতর অভিযোগের কথা তুলে ধরা হয়।

রিট আবেদনে আসিফ মাহমুদ এই সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং অসত্য বলে দাবি করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে তার অতিরিক্ত দায়িত্ব বাতিলের বিষয়টি প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর মন্ত্রণালয়ের আদেশের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া, ১৫০ জন সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির বিষয়টি তার পদত্যাগের প্রায় পাঁচ মাস পর, ১১ মে ২০২৬ তারিখে কার্যকর হয়েছে। ফলে ওই পদোন্নতির প্রক্রিয়ার সঙ্গে তার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নই ওঠে না বলে রিটে উল্লেখ করা হয়।

আবেদনকারীর দাবি, আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে তার প্রার্থিতা ঘোষণার পর অত্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে এবং পরিকল্পিতভাবে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ পরিচালনার উদ্দেশ্যে দুদকের এই প্রেস ব্রিফিংগুলো করা হয়েছে। এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং ‘তথ্য অবমুক্তকরণ নীতিমালা, ২০১১’-এর পরিপন্থি বলে রিটে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।

পরিশেষে, হাইকোর্টের কাছে আবেদন করা হয়েছে যেন দুদকের ওই দুই প্রেস ব্রিফিংয়ের বৈধতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং অনুসন্ধানাধীন বিষয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্কিত বক্তব্য প্রচার থেকে কমিশনকে স্থায়ীভাবে বিরত রাখা হয়।